Share |

অবৈধ অভিবাসনের বিভীষিকাময় যাত্রা বন্ধ হোক

সালাহ্উদ্দিন নাগরী
এ নিবন্ধ লেখার সময় বাসায় বেড়াতে আসা এক আত্মীয় (বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে উদাসীন) লেখার বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে চাইলে বললাম-‘অবৈধ অভিবাসন’। তিনি বললেন, ছোট ছোট নৌকায় সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে তরুণ-যুবকরা যে ডুবে মরছে, সে বিষয়ে? আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলাম। অবৈধ উপায়ে ইউরোপের পথে ভূমধ্যসাগরে প্রাণহানির কথা কম-বেশি সবাই জানেন। আসলেই তো ইউরোপে অভিবাসন প্রত্যাশীদের নিয়ে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি বেশ কয়েক বছর ধরে নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই ইলেকট্রনিক ও প্রিন্টমিডিয়ার খবরগুলোতে দু-চারজন বাংলাদেশির মৃত্যু ও নিখোঁজের কথা থাকছেই।
গত ২৫ জানুয়ারি নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় কয়েকজন বাংলাদেশিসহ অন্তত সাতজন অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। ইতালির কোস্টগার্ড উপকূল থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার সাগরের দিকে একটি নৌকা থেকে তিনজনকে মৃত ও এবং চারজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করলেও নৌকাটি তীরে আনার পর ওই চারজনেরও মৃত্যু ঘটে। নৌকাটিতে প্রায় ২৮০ জন আরোহীর সবাই ছিলেন মিসর ও বাংলাদেশের নাগরিক।
২০২০ সালের মে মাসের দিকে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর মিজদাহ্তে মানবপাচারকারী ও তাদের স্বজনদের গুলিতে ২৬ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারান। ২০১৯ সালে প্লাস্টিকের নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে স্পেনে পৌঁছানোর আগে সমুদ্রেই চার বাংলাদেশির সলিল সমাধি হয়। সমুদ্রযাত্রার আগে ওই দলে থাকা ১৮ বছরের বাংলাদেশি কিশোর আবু আশরাফ মোবাইল অ্যাপ ইমোর মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় জানায়, তাদের ৭৮ জনের দলটি প্লাস্টিকের নৌকায় করে স্পেনে যাবে। নৌকায় পার হওয়ার কথা শুনে পরিবার আতঙ্কিত হলে সেই কিশোর বলে, তাকে জানানো হয়েছে নদী পার হওয়ার সমান দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ভাগ্য বদলানোর আশায় দালাল চক্রের সঙ্গে তার ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয় এবং টাকার একটি অংশও সেই চক্রের কাছে পরিশোধ করা হয়। এ ধরনের ঘটনা নিয়মিত ঘটে চলেছে, যার সব হয়তো মিডিয়াতে আসে না।
আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র বাংলাদেশ, দক্ষিণ এশিয়া ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের অল্প বয়স্ক বেকার তরুণ, যুবকদের উন্নত জীবনের প্রলোভনে লিবিয়ায় নিয়ে আসে, এরপর তাদের পণবন্দি করে দেশে অবস্থানরত পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের গবেষণা অনুসারে, ইউরোপে গমনকারী বাংলাদেশিদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এই যে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার পথে লিবিয়ায় বন্দিদশা, শারীরিক নির্যাতন, ছোট নৌকা বা ট্রলারে চেপে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সলিল সমাধির আশঙ্কা ও ভীতি তাদের নিবৃত্ত করতে পারে না। তাদের পরিচিত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে কেউ যদি ওইভাবে ইউরোপে গিয়ে থাকে, তবে তাকেই তারা জীবনের মোড় ঘুরানোর ‘আইডল’ হিসাবে বেছে নিচ্ছে।
ভূমধ্যসাগর দিয়ে যত মানুষ ইউরোপে প্রবেশ করার চেষ্টা করে সেই তালিকার শীর্ষ দশে আছে বাংলাদেশ। বিবিসির তথ্যমতে, প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি এভাবে ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে। র‌্যাবের তথ্যমতে, ইউরোপের মানবপাচারের সঙ্গে দেশজুড়ে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি চক্রের খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের শরীয়তপুর, মাদারীপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী এলাকাকে ঘিরে শক্তিশালী দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে এরা সারা দেশ থেকে লোক সংগ্রহ করে সড়ক ও আকাশপথের বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে লিবিয়া নিয়ে যায়। এতে সাধারণত দুই মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগে। অনেকদিন থেকেই লিবিয়া মানব পাচারের বিপজ্জনক রুট হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিগত বছরের প্রথম নয় মাসেই লিবিয়া উপকূলে প্রায় ১১০০ অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু হয়।
বিপদসংকুল যাত্রাপথ পেরিয়ে অবৈধ অভিবাসী হয়ে সবাই কি ইউরোপে পৌঁছাতে পারছে? কেউ কেউ স্বপ্নের দেশে পৌঁছতে পারলেও অধিকাংশই হচ্ছে আশাহত। ইউএনএইচসিআর-এর তথ্যমতে, ইউরোপে যাওয়ার জন্য ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২১ লাখ লোক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট্ট নৌকা বা ট্রলারে করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছে। টাকা জোগাড়ে কেউ কেউ ভিটেমাটিও বিক্রি করে দিচ্ছে। কিন্তু ভাগ্যে জুটছে প্রতারণা, শারীরিক অত্যাচর ও মৃত্যুসহ ভয়ানক যন্ত্রণা। ইউরোপে যাওয়ার এ দীর্ঘ পথে আলো-বাতাসহীন কক্ষে মাসের পর মাস অবরুদ্ধ থাকা, বিষধর কীটপতঙ্গ ও হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে গহিন অরণ্যে অনাহার-অর্ধাহারে দিনগোনা, বিরান ধু-ধু মরুভূমির ধূলিঝড় সহ্য করে চলা, জানহাতে নিয়ে ছোট্ট নৌকায় সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে এ স্বপ্নযাত্রা যেন এক সাক্ষাৎ মৃত্যুযাত্রায় পর্যবসিত হয়। ভাগ্যক্রমে যারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে পারে, তারা হয়তো কাক্ষিত দেশেও পৌঁছতে পারে। কিন্তু এর খেসারত তো কম নয়। ওপরে উল্লিখিত ওই সময়ের মধ্যে ট্রলার ডুবে ২০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে অনেক বাংলাদেশিও রয়েছে।
লিবিয়াপ্রবাসী ও এ ব্যাপারে অভিজ্ঞজনদের মতে লিবিয়া থেকে এখন ইতালি যাওয়া প্রায় অসম্ভব। এক দালাল থেকে আরেক দালালের কাছে বিক্রি, শেষে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে আটক হয়ে দেশে ফেরত আসতে হচ্ছে। আগে লিবিয়ার সমুদ্রসীমা পার হলেই ইতালীয়রা উদ্ধার করে তাদের দেশে নিয়ে যেত, আর এখন ইতালির হেলিকপ্টার লিবিয়ার কোস্টগার্ডকে খবর দিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। ইতালি ও লিবিয়ার মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির পর চোরাই পথে ইতালিতে অনুপ্রবেশ অনেকটাই শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
এসব বিষয় নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞজনরা বলছেন, অবৈধভাবে যারা ইউরোপে যাচ্ছেন, তাদের সেখানে স্থায়ী আশ্রয় মিলছে না। কারণ ইউরোপে আশ্রয় পাওয়ার যৌক্তিকতা তারা প্রমাণ করতে পারছেন না। বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিদ্যমান ‘স্ট্যাণ্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’-এর আওতায় ‘অনিয়মিত অভিবাসী’দের ফিরে আসতে হচ্ছে।
পত্রপত্রিকার রিপোর্টমতে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা অনেক। ২০২০ সালের প্রথম দিকে কুয়েতে বিভিন্ন দেশের প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার অবৈধ অভিবাসীর হিসাব পাওয়া যায়। এদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সাধারণ ক্ষমার আওতায় বিনামূল্যে দেশে ফেরার টিকিট সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও প্রদান করা হয়। তারপরও বেশিরভাগই এ সুযোগ গ্রহণ করেননি।
কিছুদিন আগে আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিবিয়া ইউরোপ অভিমুখী অভিবাসী ও শরণার্থী স্রোত ঠেকাতে অভিযান জোরদার করেছে। বিগত কিছুদিনে বেশ ক’টি জলযান আটক করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশটির বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে সাগরপথে ইতালি বা ইউরোপে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকা চার হাজারের বেশি বিদেশিকে আটক করেছে। দালালদের খপ্পরে পড়ে যারা আটক অবস্থায় আছে, তাদের উদ্ধার করতে হবে। এ ধরনের অভিযানকে আরও বেগবান করতে যেসব দেশ ইউরোপে যাওয়ার রুট হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে, সেসব দেশকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি এসবের মাস্টারমাইণ্ড ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানাতে হবে।
অবৈধ অভিবাসনের কারণে আমাদের সহজ-সরল তরুণ-যুবকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের দেশের যেসব অঞ্চল থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি মানুষজন ইউরোপমুখী হচ্ছেন, সেসব অঞ্চলে দালাল চক্রের তৎপরতাও বেশি, তাই ওইসব জায়গায় সতর্কতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। অভিবাসন প্রত্যাশীদের সঙ্গে দালালদের নির্মমতা, বিভীষিকাময় যাত্রাপথের ভোগান্তি, প্লাস্টিকের ছোট্ট নৌকা বা ডিঙ্গিতে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনাগুলো ব্যানার, পোস্টার, লিফলেট, পুস্তিকার মাধ্যমে জনগণকে নিয়মিত অবহিত করতে হবে। পত্রপত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দালালদের কুমতলবগুলো তুলে ধরতে হবে। কারও কোনোরূপ চটুলদার কথায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য যেমন সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাতে হবে, একইসঙ্গে দালালদের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে।
আশার কথা, বাংলাদেশ থেকে গ্রিসে কৃষিকর্মী নিয়োগে বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে ০৯.০২.২২ তারিখে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ইউরোপের কোনো দেশে কর্মী নিয়োগের এটিই প্রথম চুক্তি, আপাতত শুধু কৃষিখাতে কর্মী নিলেও ভবিষ্যতে অন্যান্য খাতেও কর্মী নিয়োগের সম্ভাবনা আছে। গ্রিস বাংলাদেশ থেকে বছরে চার হাজার কর্মী নেবে এবং এদের ৫ বছরের জন্য ওয়ার্ক পারমিট দেবে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও এ ধরনের সমঝোতার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অবশ্য ইতোমধ্যে সরকার এ ব্যাপারে কার্যক্রম শুরু করেছে।
অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে উন্নত দেশের চাহিদামতো দক্ষকর্মী তৈরিতে আমাদের উদ্যোগকে বহুমুখী ও বিস্তৃত করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে হবে। বিদেশি বিভিন্ন ভাষা, বিশেষত ইংরেজির দক্ষতা ন্যূনতম একটি পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের অভিবাসন প্রত্যাশীদের বিদেশের জন্য অপরিহার্য ‘উন্নয়ন কর্মী’তে পরিণত করতে হবে। একইসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, বিদেশে গিয়ে কেউই অঢেল টাকা উপার্জন করতে পারে না। অনেকেরই নিজের থাকা-খাওয়ার পর হাতে সঞ্চয় খুব একটা থাকে না। তাই উদ্যোগী তরুণ-যুবকদের দেশেই কিছু একটা করে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। পল্লী অঞ্চলে আরও বেশি বেশি কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। দেশের কৃষিতে এখন শিক্ষিত তরুণ-যুবকরা প্রবেশ করছে। এ খাতে তাদের আগমনকে উৎসাহিত করতে হবে। পশুপালন, ফলজ কৃষি ও এ সংক্রান্ত অন্যান্য কাজে পর্যাপ্ত কারিগরি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের নিশ্চিত ও নিরাপদ জীবনের দিশা দেখাতে হবে, তাহলেই অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমে আসবে।
 লেখক : সরকারি চাকরিজীবী