Share |

পাকিস্তান : আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরতে পারেন ইমরান খান

ইমতিয়াজ আহমেদ
অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পতনে একেবারে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। মনে রাখতে হবে, ২০১৮ সালে ইমরান খান সেখানে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন বটে, তবে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ না করায় তাকে কোয়ালিশন তথা অন্যদের নিয়ে জোটবদ্ধ সরকার গঠন করতে হয়েছে। কিন্তু তাকে ক্ষমতা থেকে নামাতে বিরোধী পক্ষ যখন এক জোট হয় তখন ইমরান খানও একে একে সহযোগী হারান। সর্বশেষ তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ পিটিআই জোটভুক্ত মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট পাকিস্তান (এমকিউএম-পি)-এর পাকিস্তান পিপলস পাটির (পিপিপি) সঙ্গে যোগ দেওয়ার পরিণতি আমরা আগেই আঁচ করছিলাম। এত দিনের সহযোগীরা ইমরান খানের সঙ্গে থাকতে না চাওয়ার কারণ হয়তো তারা ভাবছিল, এ সরকারে তিন বছরের বেশি হয়ে গেছে। পিটিআইর সঙ্গে থেকে তারা যা অর্জন করতে পারবে; বিরোধী জোটে গিয়ে তার চেয়েও বেশি কিছু পাবে।
ইমরান খানের পতনের পেছনে অনেকে বিদেশের হাতও দেখছেন। তা যদিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একই সঙ্গে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেখানকার সামরিক বাহিনীর গ্রিন সিগন্যালের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি, সেখানে ক্ষমতায় থাকা-না থাকার সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক গভীর। এমনকি ইমরান খানের ক্ষমতায় আসার পেছনেও সেনাবাহিনীর সবুজ সংকেত ছিল বলে মনে করা হয়। কিন্তু এক বছর ধরে ইমরান খান ও সেখানকার সামরিক বাহিনীর মধ্যে সম্পর্কের ঘাটতিও লক্ষণীয়। ফলে বিদেশের হাত, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সর্বশেষ সম্পর্ক এবং সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক- এ দুই সম্পর্কে ঘাটতি ও আস্থার সংকটে মিল হওয়ার সঙ্গে ইমরান খানের বর্তমান পরিণতি কাকতালীয় নয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ইমরান খান যখন ২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, সবকিছু তারই পক্ষে কাজ করছে। তাকে অনেকে ‘ক্যারিশমাটিক’ রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও দেখছিলেন। এটা ঠিক, তিনি বহু দশক ধরে পাকিস্তানের রাজনীতিতে গেড়ে বসা প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পরিবারকে পাশ কাটিয়ে জয়ের দেখা পেয়েছিলেন। ইমরান খান হয়তো ভাবছিলেন, যেহেতু পুরো বিশ্বে বহু মেরূকরণ হচ্ছে এবং একক শক্তি হিসেবে আমেরিকার সে অবস্থান নেই, সেহেতু সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে আফগানিস্তান থেকে যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদায় ঘটেছে। সেখানে দ্বিতীয়বারে তালেবানের উত্থানের পর চীন, রাশিয়া এমনকি ইরানেরও নতুন ভূমিকা আমরা দেখেছি। এ অবস্থায় ইমরান খান যখন নতুন ভূরাজনৈতিক হিসাবনিকাশ করছিলেন, সেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পছন্দ করেনি।
ইমরান খান ইউক্রেন সংকটের মধ্যেই যেভাবে রাশিয়া সফর করেছেন, সেটিও যুক্তরাষ্ট্রের ভালোভাবে নেওয়ার কারণ নেই। তা ছাড়া আমরা দেখেছি, মার্চ মাসের শুরুতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যে প্রস্তাব পাস হয় সেখানে যেভাবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান তথা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ভোটদানে বিরত ছিল, তাও লক্ষণীয়। এমনকি মার্চের শেষ সপ্তাহে জাতিসংঘের দ্বিতীয় ভোটে বাংলাদেশ পক্ষে ভোট দিলেও দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ভোটদানে বিরত ছিল। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব সময় পাকিস্তানকে তার পক্ষে মনে করে। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের সময়েও পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ছিল। ফলে পাকিস্তানের নতুন অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না। বলাবাহুল্য, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ইমরান খানের সম্পর্কের ঘাটতি এবং তার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মেরূকরণের বিষয়টি বিরোধীদেরও বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল। এমনিতেই বিরোধী পক্ষ ইমরান খানের বিরুদ্ধে সুযোগ খুঁজছিল। নতুন পরিস্থিতিকে তাই তারা সেভাবে কাজে লাগাতে চেয়েছে।
পাকিস্তানের ৩৪২ সদস্যের জাতীয় পরিষদে অনাস্থা ভোটে জিততে কমপক্ষে ১৭২ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন; সেখানে শনিবার রাতের ভোটে ইমরান খানের বিরুদ্ধে ভোট পড়ে ১৭৪টি। বলতে গেলে সামান্য ব্যবধানের ভোটে হেরেছেন তিনি। ইমরান খান বিদায় নিলেও প্রশ্ন হলো- বিরোধীরা কতটা এক হয়ে থাকতে পারবে। সেখানে দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। তা ছাড়া ওই জোটের বড় দুটি দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। তা ছাড়া পাকিস্তানের অন্য যেসব সামাজিক সংকট রয়েছে তা কতটা সামাল দেওয়া যাবে, সেটাও দেখার বিষয়। তাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে নীতিগত প্রশ্ন ও ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়েও বিভেদ দেখা দিতে পারে। ফলে বিরোধী জোট ঐক্য কতদিন টিকিয়ে রাখতে পারে, সেটা সময়ই বলে দেবে। তাদের মধ্যে ফাটল ধরলে তখন নির্বাচনের প্রসঙ্গ আসবে। তাদের ঐক্যের সঙ্গেই নির্বাচন কতটা দ্রুত বা বিলম্বিত হবে, তা নির্ভর করবে।
পাকিস্তান ৭৫ বছরের ইতিহাসে প্রায় অর্ধ শতাব্দীই সামরিক শাসনের অধীনে চলেছে। এখন পর্যন্ত দেশটির কোনো নির্বাচিত সরকার তার মেয়াদ পূরণ করতে পারেনি। যদিও সরকার কতটা টিকছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন- রাষ্ট্রীয় কাঠামো ঠিক আছে কিনা। সেখানে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রয়েছে কিনা। আমরা দেখছি, নেপালেও সরকার বেশিদিন টিকে না। কিন্তু তাদের অবস্থা পাকিস্তানের মতো নয়। পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার কথা বলেছি। সেখানে যে দল সামরিক বাহিনীর সবুজ সংকেত পায়, তারাই ক্ষমতাসীন হয়। এমনকি সামরিক বাহিনীও যে কোনো সময় ক্ষমতায় চলে আসতে পারে। বিশ্ব যখন বহুমেরুর দিকে যাচ্ছে তখন পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী কী চিন্তা করছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানে রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকটও কম নয়। তবে পাকিস্তান ঘুরে দাঁড়াতে না পরার কারণও অস্পষ্ট নয়। আফগানিস্তান যেমন ৪০ বছর যুদ্ধের মধ্যে ছিল; পাকিস্তানও তেমনি যুদ্ধের বাইরে নয়। ভারতের সঙ্গে কাশ্মীর নিয়ে তার বিরোধ রয়েছে। তা ছাড়া সেখানে শরণার্থী সমস্যা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তার উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হওয়ায় অগ্রগতি লক্ষণীয় নয়। ইমরান খান এর মধ্যেও চেষ্টা করছিলেন। সেখানে দুর্নীতি একটি বড় সমস্যা। দুর্নীতির অর্থ যদি পাকিস্তানেই ব্যয় হতো, তাতেও এতটা সংকট হতো না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেমন দুর্নীতি হয়, কিন্তু ওই অর্থ দেশেই ব্যয় হয়। অথচ বাংলাদেশের মতোই পাকিস্তানের দুর্নীতির অর্থ বিদেশে চলে যায়। সে অর্থ দেশে পুনঃবিনিয়োগ হলেও তাতে দেশ উপকৃত হতো।
শেষ করব ইমরান খানের ভবিষ্যৎ আলোচনা করে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ইমরান খানের একটা জনপ্রিয়তা এখনও আছে। অনাস্থা ভোটেও আমরা দেখছি, মাত্র ২/৩ ভোটে তিনি হেরেছেন। স্বাভাবিকভাবেই ভোটের রাজনীতিতে তিনি আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসতে চাইবেন। অন্যদিকে তার বিরোধীরা চাইবে, নির্বাচন কীভাবে দীর্ঘায়িত করা যায়। কিন্তু আগেই বলেছি, বিরোধীদের রাজনৈতিকভাবে আদর্শ এক নয়। নীতিগত অনেক প্রশ্নে তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক মতবিরোধ আছে। ওলামাদের সঙ্গেও তাদের পার্থক্য অনেক। এমতাবস্থায় পাকিস্তানে নতুন বিরোধী জোটের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত হবে কিনা- সে শঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ইমরান খান আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরতে পারেন ভবিষ্যতে। কিন্তু মনে রাখতে হবে- তিনি জনসাধারণের কাছে নিজের সমর্থন কতটা বাড়াতে পারেন; একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সঙ্গেও কতটা সদ্ভাব বজায় রেখে এগোতে পারেন, তার ওপরেই তার ভবিষ্যৎ নিহিত।
 লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়