Share |

বাঁধ নির্মাণ ফিবছর : হাওরের মানুষের কান্না কেনো থামে না?

সুনামগঞ্জ,কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা তিন জেলার বোরধান ঘরে তোলার দিন যখন শুরু, কৃষকের ঘরে ফসল তোলার আনন্দের বন্যা যখন উপচে পড়ার কথা, তখনই পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যেতে চলেছে সোনার ফসল। ইতোমধ্যেই সুনামগঞ্জের শাল্লার কৈয়ার বন বাঁধ, ধর্মপাশার চন্দ্রসোনার থাল হাওর, দিরাইর চাপতির হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওরের বাঘমারা বাঁধ, নজরখালি বাঁধ ভেঙ্গে পানির তলে ফসল। কৃষকের মাথায় হাত, বুকফাঁটা আর্তনাদ আর না-থামা মাতম ফসলের মৌ মৌ গন্ধকে উড়িয়ে নিয়েছে কৃষকের জীবন থেকে। প্রশ্ন- প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট এই সংগ্রামে মানুষ সত্যি কি অসহায়? উত্তর-একুশ শতকের বিশ্ব কিন্তু তা বলে না। এই প্রাকৃতিক তাণ্ডবকে নিয়ন্ত্রণ করার কল এখন মানুষের হাতের কবজায়। চাইলেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রশ্ন উঠতেই পারে- আমরা কেন পারি না? গত কয়দিনের গণমাধ্যমের খবর- বন্যায় শুধুমাত্র সুনামগঞ্জেই পাঁচ হাজার হেক্টর জমির ফসলহানি  হয়েছে। কমপক্ষে ৫০টি বাঁধ ঝুঁকির মুখে, ভেঙ্গে গেছে ডজনখানেক।
কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৫৪টি হাওরে এবার ২ লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। তবে ঢলের পানিতে সুনামগঞ্জের আবাদি জমি তলিয়ে গেলে কত পরিমাণ বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো নেই।
সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যমতে, হাওর-প্রধান তিন জেলার ধান পাহাড়ি ঢলে নষ্ট হলে মোট ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৯১৬ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশংকা থাকে। যা দেশের মোট বোরো ধান চাষাবাদি জমির প্রায় ১১.৮ শতাংশ। দেশে উৎপাদিত মোট বোরো ধানের প্রায় ১২% হয় হাওর-প্রধান তিন জেলায়।
হাওর রক্ষা আন্দোলন সংগঠন ও কৃষকদের বক্তব্য- কোন বৎসরই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজ শুকনো মৌসুমের শুরুতে আরম্ভ করেন না, ফালগুন-চৈত্র মাসে নির্মাণ বা মেরামত শুরু করা বাঁধগুলো বন্যার প্রথম ঝাঁপটাতেই তছনছ হয়ে যায়। এরপর, এতো অল্প তহবিল দেয়া হয়, যা বাঁধ নির্মাণ করা তো দূরের কথা, ন্যূনতম মেরামতই সম্ভব হয় না। এনিয়ে প্রতিবছর হাওরের মানুষ প্রতিবাদ ও দাবী দাওয়া জানাতে হাওর ছেড়ে চলে আসেন মানববন্ধনে হয়তো সুনামগঞ্জ শহর কিংবা সিলেট শহরের শহীদ মিনারের পাশের রাস্তায়, কখনো কখনো ছুটে যান রাজধানিতে জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে। কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে হাওরের প্রতিবাদী এই বোকা-সোকা মানুষদের তাড়িয়ে দেন কখনো পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে, কখনো বুঝিয়ে-সুঝিয়ে অথবা ছোটখাটো আশ্বাস দিয়ে। কিন্তু হাওরের মানুষের কান্না থামে না।
দেশের উন্নয়নের বিবরণে আমরা পাই- হাজার হাজার কোটি টাকার নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় প্রতি বছর, যেখানে কোন কোন ক্ষেত্রে এসব প্রকল্পে জনজীবন রক্ষার ভুমিকা অপেক্ষাকৃত কম। সেক্ষেত্রে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল রক্ষার জন্য হাওরের বন্যা নিয়ন্ত্রণে উপযুক্ত তহবিল কেনো যোগান দেয়া হয় না। আর যোগান দেয়া হলে তার যথাযথ তদারিক নেই কেনো? কেনো বাস্তবায়ন করা হয় না ফসল রক্ষার জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা?
এটি গোপন নয় যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে হাওরে বাঁধ নির্মাণে চলে হরিলুট, চলে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি। প্রকল্পের টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয় না। হাওরে বাঁধ নির্মাণে হরিলুট আর নয়-ছয় নুতন নয়। আমরা জানি, বাঁধ নির্মাণ হয়?ফিবছর। আর এটি হয়ে ওঠে লুটপাটকারীদের উৎসবের উপলক্ষ। কাজের কাজ কিছুই হয় না। কারণ, কাজটা ঠিকমতো হয়ে গেলে পরের বছর আবার বরাদ্দ লুটপাটের সুযোগ নষ্ট হবে। এই নষ্ট সময়ে লুটের লালসাইতো বড় স্বপ্ন, দুর্নীতিই তো প্রধান লক্ষ্য। তাই, হাওরের মানুষের কান্না থামে না! এই কান্নার শেষ হবে লুটেরাদের বিরুদ্ধে মানুষ জয়ী হলেই কেবল। মানুষ কবে জয়ী হবে?