Share |

আবুল মাল আবদুল মুহিত: মা-বাবার কবরের পাশে সমাহিত

পত্রিকা ডেস্ক
লণ্ডন, ৭ মে: মা-বাবার কবরের পাশে সমাহিত হলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও ভাষাসৈনিক আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ৮ মে রোববার দুপুর ২টা ১০ মিনিটে সিলেটের আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে রায়নগর এলাকায় মা-বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হয় সাবেক এই অর্থমন্ত্রীকে।
জানাজায় আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও দলীয় নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।

হাসিমুখের এক সফল মানুষের বিদায়
আবুল মাল আবদুল মুহিত একজন সফল মানুষ ছিলেন। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। উদার, অসাম্প্রদায়িক ও সংস্কৃতিমনা এবং একজন আপাদমস্তক সৎ মানুষ ছিলেন তিনি। অর্থমন্ত্রী হিসেবে ১২ বার বাজেট দিয়েছেন। উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। সাবেক অর্থমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরাই বলছেন, তাঁর কোনো অপ্রাপ্তি ছিল না। তৃপ্তি নিয়েই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৫৬ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। গত বছর করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন মুহিত। তারপর থেকেই নানা ধরনের শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
ওনার জীবনে কোনো অপ্রাপ্তি ছিল না। তৃপ্তি নিয়ে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। দেশকে অনেক কিছুই দিতে পেরেছেন।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আমাদের অভিভাবক হারিয়েছি। আলোর দিশারি হিসেবে তাঁকে আমরা মিস করব।
সাবেক অর্থমন্ত্রীর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর গুলশান আজাদ মসজিদে। গত শনিবার বেলা ১১টা ৫ মিনিটে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আবুল মাল আবদুল মুহিতের মরদেহ রাখা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে ছিল দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে প্রায় ৪৫ মিনিট। সেখান থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। সেখানে বেলা দেড়টায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে মরদেহ নেওয়া হয় বনানীর নিজ বাসায়। এরপর আবুল মাল আবদুল মুহিতের মরদেহ বনানীর বাসা থেকে জন্মস্থান সিলেটের উদ্দেশে রওনা হয় বেলা পৌনে তিনটায়। রোববার সিলেটে মা-বাবার কবরের পাশে শায়িত হলেন মুহিত।
আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেট শহরের ধোপাদীঘির পাড়ে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের কর্ণধার আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ও সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরীর ১৪ সন্তানের মধ্যে তৃতীয় সন্তান মুহিত। স্ত্রী সৈয়দা সাবিয়া মুহিত একজন ডিজাইনার। তিন সন্তানের মধ্যে কন্যা সামিনা মুহিত ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ। বড় ছেলে সাহেদ মুহিত বাস্তুকলাবিদ এবং ছোট ছেলে সামির মুহিত শিক্ষক।
বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড ১২টি বাজেট দিয়েছেন মুহিত। দেশের অর্থনীতি যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে, তাতে মুহিতের অবদান অনস্বীকার্য।
এ সময় প্রয়াত মুহিতের ছোট ভাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলেন, ‘ওনার জীবনে কোনো অপ্রাপ্তি ছিল না। তৃপ্তি নিয়ে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। দেশকে অনেক কিছুই দিতে পেরেছেন।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আমাদের অভিভাবক হারিয়েছি। আলোর দিশারি হিসেবে তাঁকে আমরা মিস করব।’
আবুল মাল আবদুল মুহিত যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রি নেন আবদুল মুহিত। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। পরের বছর একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। আবুল মাল আবদুল মুহিত ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। ছাত্রজীবনে সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে যোগ দেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি)। সিএসপিতে যোগ দিয়ে তিনি ওয়াশিংটন দূতাবাসে পাকিস্তানের কূটনীতিকের দায়িত্ব নেন এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার তাঁকে ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে।

সিলেটে ঠিকই এলেন মুহিত, তবে কফিনবন্দী হয়ে
সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত (৮৮) তাঁর জন্মস্থান সিলেটে এপ্রিল মাসেই সপরিবার আসতে চেয়েছিলেন। নিয়তির বিধানে কাকতালীয়ভাবে এপ্রিল মাসের শেষ দিনটিতে মুহিত তাঁর প্রিয় শহর সিলেটে এলেন বটে, তবে কফিনবন্দী হয়ে।