Share |

জনতার ঐতিহাসিক রায় : লুতফুর ফিরলেন

লেবার পার্টির লজ্জাজনক পরাজয়
পত্রিকা প্রতিবেদন
লণ্ডন, ০৯ মে: জনতার ঐতিহাসিক রায় নিয়ে দায়িত্বে ফিরেছেন লুতফুর রহমান। ২০১৫ সালে নির্বাচনী আদালতের এক রায়ে লুতফুর রহমানের নির্বাহী মেয়র পদ কেড়ে নেয়া হয়েছিলো। নির্বাচনে নিষিদ্ধ ছিলেন ৫ বছর। সেই নিষেধাজ্ঞা
কাটিয়ে বিশাল জয়ে আবারও টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র পদে ফিরলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লুতফুর রহমান। আদালতের কেড়ে নেয়া মেয়র পদ তাঁকে আবার ফিরিয়ে দিলো টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণ। ভোটের হিসাব জানান দিচ্ছে, লুতফুর রহমানের বিরুদ্ধে নির্বাচনী বিশেষ আদালত আর প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানকে একেবারে গুড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় জনতা। এছাড়া নির্বাচনকে ঘিরে শাসকদলের চরম নেতিবাচক প্রচারণা আর কুৎসা রটনায় কান দেয়নি ভোটাররা।
কেবল মেয়র পদ নয়; এবারের নির্বাচনে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের পুরো নিয়ন্ত্রণ গেছে লুতফুর রহমান ও তাঁর এসপায়ার পার্টির কাছে। ৪৫টি কাউন্সিলারের পদের মধ্যে ২৪টিতে জয় পেয়েছেন এসপায়ার দলের প্রার্থীরা। আর লেবার দল জয় পেয়েছে মাত্র ১৯টি কাউন্সিলার পদে।
দেশব্যাপী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবার দল ভালো ফলাফল করলেও লেবারের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টাওয়ার হ্যামলেটসে ধরাশায়ী হয়েছে লুতফুর রহমান ও বাংলাদেশিদের এসপায়ার পার্টির কাছে।
নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে লুতফুর রহমানের বিজয় চমকে দিয়েছে তাঁর কট্টর সমালোচকদেরও। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে শাস্তি ভোগের পর আবার নির্বাচনে ফিরে জয় পাওয়ার এই ঘটনা যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে নজিরবিহীন। লুতফুর রহমানের এই বিজয় ব্রিটিশ মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে অন্যরকম গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইতিমধ্যে টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার দলের পরাজয়, ব্যর্থতা এবং জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতির নানা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। লেবার পার্টি এই লজ্জাজনক পরাজয়ের নেপথ্যে গত সাত বছর ধরে জন মেয়র বিগসের নানা জনবিরোধী পদক্ষেপ আর কর্মকাণ্ডকেও দায়ী করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বলা হচ্ছে, এবারের এই অপমানজনক পরাজয় থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হলে টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবারের অবস্থান আরও দূর্বল হতে থাকবে।
গত ৫ মে বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই বিভিন্ন কাউন্সিলের ফলাফল ঘোষণা হচ্ছে। তবে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের মেয়র নির্বাচনে ফলাফল ঘোষিত হয় পরদিন শুক্রবার বিকালে। দেশব্যাপী লেবার দল ভালো ফলাফল করেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে টাওয়ার হ্যামলেটসে সেই লেবারকেই ধরাশায়ী করে নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লুতফুর রহমান। তিনি তৃতীয়বারের মত টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হলেন।
২০১৮ সালে গঠিত এসপায়ার দলের প্রার্থী হিসেবে এবার লুতফুর রহমান নির্বাচন করেন। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ৪০ হাজার ৮০৪। আর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার দলের জন বিগস পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৪৮৭ ভোট। অবশ্য প্রথম পছন্দের ফলাফলেই লুতফুর রহমান নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জন বিগসের চাইতে ১১ হাজার ৬৩৯ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। প্রথম পছন্দে লুতফুর রহমানের প্রাপ্ত ভোট ৩৯ হাজার ৫৩৩। আর জন বিগসের প্রাপ্ত ভোট ২৭ হাজার ৮৯৪। তবে কোনো প্রার্থীই মোট প্রদত্ত ভোটের অন্তত ৫১ শতাংশ না পাওয়ায় প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর দ্বিতীয় পছন্দের ভোট গণনা করা হয়। এতে দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান কিছুটা কমলেও লুতফুর রহমানের বিজয় ঠেকানো যায়নি।
এবার টাওয়ার হ্যামলেটসে মোট ভোটার ছিলেন প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার। এরমধ্যে ভোট দিয়েছেন ৮৬ হাজার ৯জন যা মোট ভোটের ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশ। বাতিল হওয়া ব্যালটের সংখ্যা ১৮৬৪।
বিজয়ের প্রতিক্রিয়ায় লুতফুর রহমান বলেন, টাওয়ার হ্যামলেটসের বাসিন্দারা তাঁকে আবার মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করে সেবা করার সুযোগ দেয়ায় তিনি কৃতজ্ঞ। যারা তাঁকে ভোট দিয়েছেন এবং যারা দেননি সকলের জন্য সমানভাবে সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনঃব্যক্ত করেন তিনি। আদালতের রায়ের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, জনগণের রায় হচ্ছে প্রকৃত রায়। টাওয়ার হ্যামলেটসের মানুষ তাঁর প্রতি আস্থা রেখেছেন। তিনি এই আস্থার প্রতিদান দেবেন তাদের জীবনমান উন্নয়নে ভালো সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে।
সিলেটের বালাগঞ্জের সিকান্দারপুরের সন্তান লুতফুর রহমান। তিনি ছিলেন লেবার দলীয় রাজনীতিক। কাউন্সিলে লেবার লিডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালে নানা নাটকীয়তার পর নির্বাহী মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পেলেও আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশীর ‘ভূয়া’ অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে নির্বাচনের মাত্র একমাস আগে লেবার পার্টি তাঁর মনোনয়ন কেড়ে নিয়ে অভিযোগ দায়েরকারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়। লুতফুর রহমান এই অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই লুতফুর রহমান ২০১০ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টি প্রার্থী হেলাল আব্বাসের বিরুদ্ধে দ্বিগুণেরও বেশি ভোটে টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রথম নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস রচনা করেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে লেবার দলের প্রার্থী জন বিগসকে হারিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে জয় পেয়েছিলেন লুতফুর রহমান। কিন্তু ওই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ উঠে এবং পরবর্তীতে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। আদালতের রায়ে লুতফুর রহমান ২০১৫ সালের শুরুতে মেয়র পদ থেকে অপসারিত হন। তিনি এসব অভিযোগ কখনোই স্বীকার না করলেও এ রায় মেনে নিতে বাধ্য হন। নির্বাচনে ৫ বছর নিষিদ্ধ থাকার কারণে ২০১৫ সালের উপ-নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে লুৎফুর রহমান অংশ নিতে পারেননি। ওই দুই নির্বাচনে জিতে টানা ৭ বছর ক্ষমতায় ছিলেন লেবার দলীয় জন বিগস।  
২০১৪ সালে লুতফুর রহমানের প্রাপ্ত ভোট ছিলো ৩৭ হাজার ৩৯৫। এবারের বিজয়ে ৪০ হাজার ৮০৪ ভোটের নতুন রেকর্ড গড়লেন তিনি।
এক সময় লুতফুর রহমানের সহযোগী রাবিনা খান এবার লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হিশেবে মেয়র নির্বাচন করেন। লুতফুর রহমানের অনুপস্থিতে ২০১৫ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে রাবিনা খান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু লিবডেমের প্রার্থী হিসেবে এবারের নির্বাচনে রাবিনা খান ভোট পেয়েছেন ৬ হাজার ৪৩০। অন্যান্য মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে কনজারভেটিভ দলের এলিয়ট ওয়েভার ৪ হাজার ২৬৯ ভোট, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট অ্যাণ্ড সোশ্যালিস্ট কোয়ালিশনের প্রার্থী হিউগো পিয়ার পেয়েছেন ১৪৬২ ভোট এবং দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে এণ্ড্রু জর্জ উড পেয়েছেন ৩ হাজার ৯৮৫ ভোট ও পামেলা অ্যান হোমস পেয়েছেন ৫৫২ ভোট।

কাউন্সিলার পদেও ধরাশায়ী লেবার
গত মেয়াদে লেবারের দখলে ছিলো ৪০টি কাউন্সিলার পদ। এবার দলটি ২১টি কাউন্সিলার পদ হারিয়েছে। জিতেছে মাত্র ১৯টি কাউন্সিলার পদে। আর এসপায়ার পার্টি ২৪টি কাউন্সিলার পদ জিতে নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। কাউন্সিলার পদে জেতা বাকী দলগুলো হলো কনজারভেটিভ এবং গ্রিন পার্টি। তারা ১টি করে কাউন্সিলার পদ জিতেছে। নির্বাচিত মোট ৪৫ জন কাউন্সিলারের মধ্যে ৩৭ জনই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত।
লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের মেয়র প্রার্থী রাবিনা খান মেয়র পদের পাশাপাশি কাউন্সিলার পদেও প্রার্থী হয়েছিলেন। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে কাউন্সিলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা রাবিনা খান এবার কাউন্সিলার পদেও জিততে পারেননি। এসপায়ার প্রার্থীর কাছে আসনটি হারিয়েছেন। এছাড়া লেবার দলের ডেপুটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মতিনুজ্জামানও এবার জিততে পারেননি।
দলগতভাবে এবারের নির্বাচনে এসপায়ার পার্টির প্রাপ্ত ভোট ৩৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। লেবারের প্রাপ্ত ভোট ৩৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এছাড়া গ্রিন পার্টি ৯ শতাংশ কনজারভেটিভ ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাট ৮ দশমিক ৯২ শতাংশ ভোট পেয়েছে। বাকীদের ভোট পাওয়ার হার ১ শতাংশের কম।
টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রায় ৩০ শতাংশ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী। এখানকার রাজনীতি ও নির্বাচনে বাঙালিদের অংশগ্রহণ ও উদ্দীপনা বরাবরই অগ্রগণ্য। ভোটার উপস্থিতিতেও বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকেন বাঙালিরা। মূলত এদের ভোটই নির্বাচনী ফলাফলে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।