Share |

টি ২০ -র নতুন রাজা অস্ট্রেলিয়া

নিউজিল্যান্ড ১৭২/৪, ২০ ওভারে * অস্ট্রেলিয়া ১৭৩/২, ১৮.৫ ওভারে * ফল : অস্ট্রেলিয়া ৮ উইকেটে জয়ী
ঢাকা, ১৫ নভেম্বর : শর্ট থার্ড ম্যান দিয়ে টিম সাউদিকে রিভার্স সুইপ শটে বাউন্ডারি হাঁকাতেই গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের দিকে ছুটে গেল হলুদ বন্যা। সতীর্থদের আলিঙ্গনে যেন হারিয়ে গেলেন ৩১ বলে ৫০, ৫০ বলে ৭৭* রান করা মিচেল মার্শ।
সঙ্গে সঙ্গে দুবাইয়ের রাত আতশবাজির আলোয় বর্ণিল হয়ে উঠল। গ্যালারিতেও যেন উড়ল শয়ে শয়ে হলুদ প্রজাপতি। যা কিছু প্রথম সবই স্মরণীয়। ভোলা যায় না।
অস্ট্রেলিয়াও ভুলবে না তাদের প্রথম টি ২০ বিশ্বকাপ জয়ের রাত। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আট উইকেটের অবিস্মরণীয় জয় যার হাত ধরে এলো, সেই মার্শ আতশবাজির আলো ছড়ানোর আগে তার উইলোতে রানের আলো জ্বাললেন। রোববারের রাতটা ছিল মার্শের। অস্ট্রেলিয়ার।
সাত বল বাকি থাকতে টি ২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে সবচেয়ে বেশি রান (১৭৩) তাড়া করে জেতার গরিমা অসিদের প্রথম শিরোপার শোভা বাড়িয়ে দেয় শতগুণ। আড়ালে চলে যায় কেন উইলিয়ামসনের ম্যাজিক (৪৮ বলে ৮৫ রান)। ফাইনাল কেন বারবার কিউইদের কাঁদায়, এই প্রশ্ন এখন তাসমানতীরের দেশের মানুষের মাথায় ঘুরপাক খাবে। পড়শিরা যখন আনন্দের সুরভি ছড়াবে, নিউজিল্যান্ডে তখন আরেকটি ট্রফি ফসকানোর আক্ষেপ পোড়াবে সবাইকে।
অস্ট্রেলিয়া বোধহয় টস জেতার অনুশীলন করে আরব আমিরাতে এসেছিল। ফিঞ্চ এ নিয়ে সাত ম্যাচে ছয়বার টস জিতলেন। টস জেতো ট্রফি ঘরে নিয়ে যাও। এই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েই হয়তো টস জেতার অনুশীলন সেরে এসেছিল অস্ট্রেলিয়া। সেমিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে টস জিতে ফিল্ডিং নিয়ে পাঁচ উইকেটের জয়। ফাইনালেও অভিন্ন গল্প।
কে যেন বলছিলেন, ২০০৩ থেকে প্রতি ছয় বছর পরপর অস্ট্রেলিয়া বড় ট্রফি জেতে। এবার তাদের হিসাবেই রাখা হয়নি। অথচ, শেষ মহারণে জয়ী হলো তারাই। রেকর্ড পাঁচবার ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতা অস্ট্রেলিয়া অবশেষে পেল প্রথম টি ২০ বিশ্বকাপ ট্রফির দেখা। এরআগে ২০১০ আসরের ফাইনালে তারা হেরেছিল ইংল্যান্ডের কাছে। সেই দলে
থাকা ডেভিড ওয়ার্নার এবার সাত ম্যাচে ২৮৯ রান করে হলেন টুর্নামেন্টসেরা। আর ফাইনালের ম্যাচসেরা মিচেল মার্শ। মুদ্রার উলটো পিঠে নিউজিল্যান্ডের জন্য বিশ্বকাপ ফাইনাল দুঃখগাথাই হয়ে রইল। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া ও ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনালে তারা হেরেছিল ইংল্যান্ডের কাছে। নিজেদের প্রথম টি ২০ বিশ্বকাপ ফাইনালেও বহু আরাধ্য ট্রফিটা ধরা দিল না কিউইদের হাতে।
১৭৩ রানের কঠিন লক্ষ্য তাড়ায় তৃতীয় ওভারে অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ বিদায় নিলেও অস্ট্রেলিয়াকে সেই ধাক্কা বুঝতেই দেননি মার্শ ও ওয়ার্নার। দ্বিতীয় উইকেটে তাদের ৫৯ বলে ৯২ রানের জুটিতেই ম্যাচের ফল নিয়ে সব সংশয় মুছে যায়। ওয়ার্নার ৩৮ বলে ৫৩ রান করে ফেরার পর ম্যাক্সওয়েলকে (১৮ বলে ২৮*) নিয়ে বাকি কাজ সারেন মার্শ। ছয় চার ও চার ছক্কায় ৫০ বলে তিনি করেন অপরাজিত ৭৭ রান। মার্শের ৩১ বলে ফিফটি টি ২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড। ১৮ রানে দুই উইকেট নেওয়া ট্রেন্ট বোল্ট ছাড়া নিউজিল্যান্ডের কোনো বোলারই দাগ কাটতে পারেননি ফাইনালে।
ম্যাচের প্রথমভাগে ঝড় তুলেছিলেন নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক কেইন উইলিয়ামসন। তার চওড়া ব্যাটেই টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা কিউইরা চার উইকেটে ১৭২ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর গড়ে। ১০ চার ও তিন ছক্কায় ৪৮ বলে ৮৫ রানের টর্নেডো ইনিংস উপহার দেন উইলিয়ামসন। স্পর্শ করেন টি ২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড। গত আসরের ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মারলন স্যামুয়েলসও করেছিলেন ৮৫* রান। কাল ২১ রানে উইলিয়ামসনের ক্যাচ ফেলে অস্ট্রেলিয়ার ভোগান্তি বাড়ান জশ হ্যাজলউড।
পরে তিনিই ফিরিয়েছেন উইলিয়ামসনকে। কিন্তু ততক্ষণে নিউজিল্যান্ড পেয়ে যায় বড়সড় পুঁজি। উইলিয়ামসন-ঝড়ে শেষ ১০ ওভারে নিউজিল্যান্ড তোলে ১১৫ রান। ৩৫ বলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৮ রান করেন ওপেনার মার্টিন গাপটিল। এ ছাড়া গ্লেন ফিলিপস ১৭ বলে ১৮ ও জিমি নিশাম সাত বলে ১৩* রান করেন। নিউজিল্যান্ডের ইনিংসে ছয়টি ছক্কার তিনটিই মেরেছেন উইলিয়ামসন।
প্রথম ২০ বলে ১৯ রান করা উইলিয়ামসন টানা দুই ছক্কায় ফিফটি স্পর্শ করেন মাত্র ৩২ বলে। টি ২০ বিশ্বকাপের সব আসর মিলিয়েই ফাইনালে দ্বিতীয় দ্রুততম ফিফটি এটি। তৃতীয় উইকেটে গ্লেন ফিলিপসকে নিয়ে ৩৭ বলে ৬৮ রান যোগ করেন উইলিয়ামসন। এই জুটিতে ফিলিপসের অবদান ১৭ বলে ১৮ রান। ১৮তম ওভারে হ্যাজলউডের জোড়া ছোবলে ঘুরে দাঁড়ায় অস্ট্রেলিয়া।
ফিলিপসের পর বড় বাধা উইলিয়ামসনকেও ফেরান হ্যাজলউড। চার ওভারে ১৬ রানে তিন উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সফলতম বোলার হ্যাজলউডই। এছাড়া ২৬ রানে এক উইকেট নেন জাম্পা। পেসার মিচেল স্টার্ক চার ওভারে ৬০ রান দিয়ে ছিলেন উইকেটশূন্য। এবারের আসরে এটাই সবচেয়ে খরুচে বোলিংয়ের রেকর্ড। টি ২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে সব আসর মিলিয়েও সবচেয়ে খরুচে বোলিং এটি। তবে শিরোপা জেতায় দিন শেষে এ নিয়ে আর আক্ষেপ করতে হয়নি স্টার্ককে।