Share |

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ : বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা

বাঙালির জীবনে মার্চ মাসটি অগ্নিঝরা বলেই ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। আর এই আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে গিয়েছিলো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ থেকেই। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে জাতির নেতা এদিনটিতে এই ভাষণ দিয়েই সমগ্র জাতিকে মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তোলেন। এর মাত্র ১৭ দিন পর নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক হানাদার বাহিনি। শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। প্রতিরোধ যুদ্ধ রূপ নেয় মুক্তিযুদ্ধে।
দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর হানাদারমুক্ত আমরা পাই স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটি এখন জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভের মাধ্যমে বিশ্বঐতিহ্য।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ২০১৭ সালে এ ভাষণকে ‘বিশ্বঐতিহ্য সম্পদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব ওয়ার্? রেজিস্টার’-এ স্থান করে দিয়েছে।
বহু বছর পরে এই ভাষণের বিশ্বসভার স্বীকৃতি মিললেও দুনিয়ার বিখ্যাত সংবাদ মাধ্যম সেসময়ই এই ভাষণকে আধুনিক কবিতা বলে আখ্যায়িত করেছে আর এই চেতনার মশাল জ্বালানো ভাষণ যিনি দিলেন তাকে অভিবাদন জানিয়েছে ‘রাজনীতির কবি’ বলে।
বঙ্গবন্ধু এই ভাষণ নিয়ে এখন নানা কথা, নানা বিশ্লেষণ। এই ভাষণ যে কত মূল্যবান হিশেবে দুনিয়াজুড়ে বিবেচিত হচ্ছে তা নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। কিন্তু আমরা কি নিজেদের প্রশ্ন করি যে ভাষণকে আজ বিশ্বসভা এতো ঐহিত্যবাহী মনে করে এর দাম দিয়েছে সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু যে আদর্শ-চেতনা-প্রেরণা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার অংশবিশেষও আমরা ধরে রাখতে পেরেছি কীনা?
কবি আবুল মোমেন লিখেছেন, আমরা ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারিনি। এমনকি তাঁর রেখে যাওয়া অতুলনীয় সম্পদ এই ভাষণের চর্চা করিনি, কেবল এটাকে ব্যবহার করে ফায়দা পেতে চেয়েছি, যখন-তখন মাইক্রোফোনে বাজিয়ে দিয়েছি এর পবিত্রতা ও মহত্ত্বের কথা না ভেবে।
সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু গরিবের ওপর নির্যাতন, বাংলার মানুষের বুকের ওপর গুলিচালনা, মানুষ হত্যা করে মায়ের বুক খালি করার কাহিনী তুলে ধরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে এসব এসে দেখে যেতে আহবান জানিয়েছিলেন। রক্তের দাগ মাড়িয়ে, শহীদের লাশের ওপর পা দিয়ে অ্যাসেমব্লিতে যোগদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তথাপি, বাংলাদেশে সেসময় যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান থাকার পরও বঙ্গবন্ধু তার সৌজন্যবোধ হারাননি। কিন্তু আজ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’য় কি রাজনীতি হচ্ছে তা বলা বাহুল্য।
এসব আলোচনার বাইরে আরো একটি বিষয় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে?আমরা মনে করতে পারি। আর সেটি হচ্ছে, উপমহাদেশের অন্যান্য রাষ্ট্রের স্বাধীনতার সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ ভিন্ন। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে নয়?মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে?এনেছে। অন্যদের বেলায় স্বাধীনতা এভাবে অর্জিত হয়নি। আমাদের বিজয় রক্তস্নাত, এ বিজয় সীমাহীন হারানোর বেদনাভরা। এই রক্তে কেনা, অশ্রুভেজা স্বাধীনতা অর্জনের ডাকটা এসেছিলো বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে ৭ই মার্চে। তাই ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাই বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা।
তবে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার পাশাপাশি ‘মুক্তির সংগ্রাম’-এর ঘোষণাও ছিলো। পঞ্চাশ বছর পরও বড় প্রশ্ন, আমরা কি সেই পথে হাঁটছি? এই প্রশ্ন নিয়েই আমরা পঞ্চাশতম বর্ষ অতিক্রম করছি সেই রমনার রেসকোর্স ময়দানের উত্তাল গণসমাবেশে চেতনার স্ফুলিঙ্গ বর্ষণের। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের কালজয়ী ভাষণ হোক আমাদের এগিয়ে যাবার প্রেরণা, ভুল শোধরানোর মন্ত্র।