Share |

খাদ্য মূল্যস্ফীতি : যুক্তরাজ্যে অভুক্ত মানুষ বাড়ছে

পত্রিকা ডেস্ক
লণ্ডন, ১৬ মে: একসময় এই উপমহাদেশের অনেক মানুষ আধাপেট খেয়ে দিন পার করতেন বা রাতের বেলা খেতেন না- এই ইতিহাস খুব পুরোনো নয়। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে খবর আসছে, যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশের মানুষও নাকি এখন এক বেলা উপোস করছেন বা খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। দ্য ফুড ফাউণ্ডেশনের এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
করোনা মহামারি যখন বিশ্বসম্প্রদায় প্রায় কাটিয়ে উঠেছিল, তখনই শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধের জেরে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম সারা বিশ্বেই হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। এর জেরে এখন যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশের মানুষের এখন উপোস করতে হচ্ছে।
জরিপের তথ্যানুসারে, প্রতি সাতজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে একজন এক বেলা উপোস থাকছেন বা খাবারের পদ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। খাদ্য প্রস্তুতকারকেরা এখন জ্বালানির উচ্চমূল্যের ভার ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিতে শুরু করেছেন। এর ফলে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ৩০ বছরের মধ্যে তা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, ব্যাংক অব ইংল্যাণ্ডের পূর্বাভাস, মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশে উঠতে পারে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে যুক্তরাজ্যের অনেক মানুষ এখন হিমায়িত খাদ্যের দিকে ঝুঁকছেন। কারণ, খাবার রান্না করতে গেলে তো আবার গ্যাস বা বিদ্যুতের বিল বেড়ে যাবে।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৫৭ শতাংশ মানুষ বলেছেন, গত তিন মাসে খাদ্যের সংস্থান করতে গিয়ে তাঁদের হিমশিম খেতে হয়েছে।
১৪ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা নিজেরা বা পরিবারের কেউ না কেউ গত মাসে খাবারের পদ কমিয়েছেন বা এক বেলা উপোস থেকেছেন। অথচ জানুয়ারি মাসে এমন কথা বলেছিলেন ৮ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ।
ফুড ফাউণ্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আনা টেইলর বিবিসিকে বলেছেন, বিষয়টি এখন আর নিছক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং তা ক্রমশ স্বাস্থ্যসংকটে পরিণত হচ্ছে। ফলে এখন শুধু খাদ্যব্যাংক দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না।
এই পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের এক সরকারি মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি, মানুষের জীবনযাত্রায় কী পরিমাণ চাপ পড়ছে। এ অবস্থায় আমরা সরকারের পক্ষ থেকে যা করার, তা করছি। সরকার মানুষের বিদ্যুৎ ও গাড়ির জ্বালানির মূল্য পরিশোধে সহায়তা করার জন্য ২ হাজার ২০০ কোটি পাউণ্ড ব্যয় করছি। এ ছাড়া সর্বজনীন ঋণের আওতায় পূর্ণকালীন কর্মীদের ন্যূনতম মজুরি বার্ষিক অন্তত ১ হাজার পাউণ্ড বৃদ্ধি করেছি। সঙ্গে আছে আমাদের হাউসহো? সাপোর্ট ফাণ্ড। এই তহবিল থেকে আমরা মানুষকে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে সহায়তা করছি।’ এপ্রিলের ২২ থেকে ২৯ তারিখের মধ্যে যুক্তরাজ্যের ১০ হাজার ৬৭৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে।

খাদ্যমূল্য ২০ শতাংশ বাড়তে পারে
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি খাদ্যমূল্যও বাড়ছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলেছে, যুদ্ধের কারণে এ বছর বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। খাদ্যের দাম বাড়লে অবধারিতভাবে বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গম রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন। বৈশ্বিক পরিসরে রুটির ভাণ্ডার হিসেবে তাদের খ্যাতি আছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে যবের ১৯ শতাংশ, গমের ১৪ শতাংশ ও ভুট্টার ৪ শতাংশ তারা রপ্তানি করে। সামগ্রিকভাবে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যশস্যের জোগান দেয় এই দুই দেশ।
এভাবে যুদ্ধ চলতে থাকলে ইউক্রেন শস্য উৎপাদন করতে পারবে কি না এবং করলেও রপ্তানি কতটা করতে পারবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। যুদ্ধের কারণে ভবিষ্যতে রাশিয়ার পণ্য রপ্তানিতে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের এই সংস্থা।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি কর্মসূচির মহাপরিচালক কিউ দোং এক বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, শীর্ষ এই দুই রপ্তানিকারক দেশের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির সমস্যা
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের এক গবেষণায় জানা যায়, শহরের প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলো গড়ে তাদের মোট খরচের ৬১ দশমিক ৩১ শতাংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। আর গ্রামীণ প্রান্তিক গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তা ৬৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। তাই খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়লে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষেরা খাদ্য ব্যয় কমাতে বাধ্য হন।