Share |

বিতর্কিত ‘স্টপ অ্যাণ্ড সার্চ’ : পুলিশকে অবাধ ক্ষমতা

পত্রিকা প্রতিবেদন
লণ্ডন, ১৬ মে: রাস্তা-ঘাটে যখন-তখন তল্লাশি (স্টপ অ্যাণ্ড সার্চ) চালানোর ক্ষেত্রে পুলিশের ওপর যেসব নিয়ন্ত্রণ ছিলো তা তুলে নিয়েছেন হোম সেক্রেটারি প্রীতি পাটেল। ১৬ মে সোমবার তিনি ওইসব নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়ার ঘোষণা দেন। এর ফলে যত্রতত্র মানুষকে নিজের খেয়াল-খুশিমত তল্লাশি চালানোর ক্ষেত্রে পুলিশ অনেকটা অবাধ ক্ষমতা পেলো।
বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের নেতারা হোম সেক্রেটারির এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করছেন। তারা বলছেন, স্টপ অ্যাণ্ড সার্চে পুলিশ ক্ষমতার অপব্যবহার করতো। এর ফলে কৃষ্ণাঙ্গ ও সংখ্যালঘু কমিউনিটির লোকেরা অবাধে হয়রানির শিকার হতো। সেজন্য সরকার ২০১৪ সালে বিতর্কিত নীতি স্টপ অ্যাণ্ড সার্চে পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে বাধ্য হয়েছিলো। প্রীতি পাটেল সেইসব নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়ে ভালো কাজ করেননি। তার এই সিদ্ধান্তের ফলে সংখ্যালঘু কমিউনিটির মানুষ আবারও অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তল্লাশির শিকার হবেন এবং হয়রানির কবলে পড়বেন। এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রে নতুন নতুন বাধার সৃষ্টি করবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তবে প্রীতি পাটেল বলেছেন, নাইফ ক্রাইমসহ সমাজে চলমান অপরাধ দমন করতে স্টপ অ্যাণ্ড সার্চের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য পুলিশকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রিমিনাল জাস্টিস অ্যাণ্ড পাবলিক অর্ডার অ্যাক্টের সেকশন-৬০-এর আওতায় পুলিশ অপরাধ দমনে স্টপ অ্যাণ্ড সার্চ করে থাকে। কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়াই যে কোনো ব্যক্তিকে পুলিশ তল্লাশি চালাতে পারে। কালো এবং সংখ্যালঘু কমিউনিটির লোকজন শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় বহু গুণ বেশি পুলিশি তল্লাশির শিকার হচ্ছেন এবং অযথা হয়রানির ঘটনা ঘটছে-এমনটি ধরা পড়ার পর ২০১৪ সালে তৎকালীন হোম সেক্রেটারি থেরেসা মের আমলে পুলিশের ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। আরোপিত নিয়ন্ত্রণ অনুয়ায়ী অপরাধ কিংবা সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে এমন স্থানে পুলিশ স্টপ অ্যাণ্ড সার্চ করতে পারতো। সর্বোচ্চ ১৫ ঘন্টা পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে আটক রাখতে পারতো এবং কোনো এলাকায় ৩৯ ঘন্টা পর্যন্ত সেকশন-৬০ জারি রাখতে পারতো।
প্রীতি পাটেল এসব নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়ার ফলে এখন পুলিশ ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে আটক রাখতে পারবে এবং ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত সেকশন-৬০ কার্যকর রাখতে পারবে।
আগে সিনিয়র অফিসারকে স্টপ অ্যাণ্ড সার্চের অনুমোদন দিতে হতো। এখন ইন্সপেক্টর সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আর সুপারিন্টেণ্ডেন্ট সেকশন-৬০ জারির মেয়াদ বৃদ্ধি অনুমোদন করবেন।
আগে কোনো স্থানে সংঘাত বা অপরাধ ঘটবে এমন আশঙ্কা তৈরি হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার স্টপ অ্যাণ্ড সার্চ অনুমোদন করতে পারতেন। এখন সংঘাত বা অপরাধ ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা করলেই অফিসার স্টপ অ্যাণ্ড সার্চ অনুমোদন করতে পারবেন। ফলে স্টপ অ্যাণ্ড সার্চ প্রয়োগের বিষয়টি এখন পুলিশের জন্য বেশ সহজ হলো।
প্রীতি পাটেল বলেন, প্রিয়জন হারানো পরিবারগুলোর ওপর নাইফ ক্রাইমের প্রভাব অসহনীয়। নাইফ ক্রাইমে কারও প্রিয়জন হারানো গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ নিয়ে আমাদের সাধ্যের সবটুকু করার দায়িত্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, ২০১৯ সালের পর স্টপ অ্যাণ্ড সার্চের হার প্রায় ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এরফলে প্রায় ৫০ হাজারটি অস্ত্র উদ্ধার সম্ভব হয়েছে।
হোম সেক্রেটারি প্রীতি পাটেল আরও বলেন, আমি আমার পূর্ণ আন্তরিকতা দিয়ে আমাদের পুলিশ বাহিনীর পাশে থাকতে চাই। যাতে তারা নাইফ ক্রাইম বন্ধে কার্যকর ভূমিরা রাখতে পারে, সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার এবং বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজ করতে পারে।
তবে স্ট্যাণ্ডআপ টু রেইসিজমের সহকারী কনভেনর ওয়েম্যান বেনেট গার্ডিয়ানকে বলেন, সুবিবেচনাহীন এই পদক্ষেপ অপ্রয়োজনীয় সংঘাত সৃষ্টি করবে। পুলিশের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণ ছিলো দুটি পুলিশ রিপোর্টে দেখা গেছে স্টপ অ্যাণ্ড সার্চে কালো কমিউনিটির লোকেরা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তল্লাশির শিকার হচ্ছেন এবং অযথা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রীতি পাটেল আমাদের নাগরিক অধিকারকে ময়লার ঝুঁড়িতে ফেলে দিয়েছেন।
ইংল্যাণ্ড এবং ওয়েলসের সবগুলো পুলিশ ফোর্স নাইফ ক্রাইমের বিরুদ্ধে এক সপ্তাহব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। এমন অভিযানের সময়ে কাকতালীয়ভাবে প্রীতি পাটেলের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আসলো।
২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কালো মানুষেরা স্টপ অ্যাণ্ড সার্চে শেতাঙ্গদের চাইতে সাতগুন বেশি তল্লাশির শিকার হন। আর এশিয়ান লোকজন তল্লাশির শিকার হন শেতাঙ্গদের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি।
আইওপিসির এক রিপোর্টে উঠে আসে এক কিশোর ৬০ বার স্টপ অ্যাণ্ড সার্চের শিকার হয়েছে। গার্ডিয়ানের রিপোর্টে বলা হয় ওই কিশোর ২০১৮ সাল তল্লাশির শিকার হচ্ছেন, যখন তার বয়স ছিলো মাত্র ১৪ বছর। তাকে দিনে একাধিকাবার তল্লাশির ঘটনাও আছে বহু।