Share |

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মৃত্যুতে শোক

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী : এক মহাপ্রাণের মহাপ্রয়াণ
নবাব উদ্দিন

বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির ইতিহাসে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী একটি চিরস্মরণীয় নাম, একটি অধ্যায়। বাঙালির জাতীয় জীবনে অনন্য অবদানে স্বীকৃত এ মহাপ্রাণ ব্যক্তিটি আমাদের প্রিয় গাফফার ভাই, যিনি মাত্র দু’দিন আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন চিরতরে। অজেয় কলম সৈনিক, অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি গাফফার ভাইয়ের মহাপ্রয়াণে আমরা সত্যিই বেদনাহত।
গাফফার ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক দীর্ঘ চল্লিশ বছরের। আমার বহু নাটকের নাট্যরূপ দিয়েছেন এই শক্তিধর কলমযোদ্ধা। তিনি ছিলেন সাংবাদিক সমাজের অভিভাবক। শুধু ব্রিটেন নয়, সারা পৃথিবীর বাঙালির মুখপাত্র ছিলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। তাঁর ক্ষুরধার রাজনৈতিক লেখনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছে বহুবার। মুক্তিযুদ্ধ আর বাঙালি- এই দুটি ইস্যুতে তিনি আপোসহীন, অনড় ছিলেন আমৃত্যু। বাংলাদেশের প্রতিটি দুঃসময়ে তিনি কলমকে অস্ত্র করে অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন।
মহান রাব্বুল আলাআমিন পবিত্র কোরআন কারিমে বলেছেন, “কুল্লু নাফসিন জা’য়িকাতুল মাউত।” অর্থাৎ, প্রত্যেক প্রাণীকেই আস্বাদন করতে হবে মৃত্যুর স্বাদ। (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫)। মৃত্যুর সংবাদ দিয়ে কোরআন পাকে আল্লাহ তায়ালা এভাবে চারবার মানুষকে হুঁশিয়ার করেছেন। আল্লাহর হুকুমে যে মানুষের সৃষ্টি সেই মানুষ আবার একদিন আল্লাহর হুকুমেই বিদায় হয়ে যায়। শেষ হয়ে যায় অনেক সাধের এই জীবনলীলা।
অমর একুশে গানের রচয়িতা আবদুল গাফফার চৌধুরী লণ্ডনের বার্নেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার ১৯ মে ২০২২, সকাল ৬টা ৪৯ মিনিটে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। ডায়াবেটিস, কিডনি রোগসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন প্রিয় গাফ্ফার ভাই। বছরদেড়েক ধরে তাকে প্রায়ই হাসপাতালে নিয়মিত যেতে হতো এবং থাকতে হতো। কিন্তু গত টানা তিন মাস ধরে তিনি বার্নেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃত্যুকালে গাফফার চৌধুরী এক ছেলে, তিন মেয়ে ও নাতি-নাতনি রেখে গেছেন। তাঁর আরেক মেয়ে (ছোট মেয়ে) বিনীতা চৌধুরী গত ১৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।
গাফফার চৌধুরী ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের ওলানিয়া গ্রামের জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শুরুতে তিনি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববদ্যালয় থেক স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৯ সালে গাফ্ফার চৌধুরীর প্রথম গল্প ‘সওগাত’ পত্রিকায় ছাপা হয়। পরবর্তীতে তিনি দৈনিক ইনসাফ, দৈনিক সংবাদ, মাসিক সওগাত, মাসিক নকীব পত্রিকায় কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকে সহকারি সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি জয়বাংলা, যুগান্তর ও আনন্দবাজার পত্রিকায় কাজ করেন। তার বাবার নাম হাজি ওয়াহিদ রেজা চৌধুরী ও মায়ের নাম জহুরা খাতুন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সপরিবারে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলা হয়ে কলকাতা পৌঁছান। সে সময় তিনি মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক জয়বাংলায় লেখালেখি করেন। পাশাপাশি কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার ও যুগান্তর পত্রিকার কলামিস্ট হিসেবেও কাজ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি দৈনিক জনপদ প্রকাশ করেন। ১৯৭৩ সালে গাফফার চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর সাথে আলজিয়ার্সে ৭২ জাতি জোট নিরেপক্ষ সম্মেলনে যান এবং দেশে ফেরার পর তার স্ত্রী সেলিনা আফরোজ গুরুতর অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য তাকে প্রথমে কলকাতা নিয়ে যান। সেখানে পরিপূর্ণ সুস্থ না হলে বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ অনুযায়ী তিনি লণ্ডনে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ৫ অক্টোবর ১৯৭৪ সালে সস্ত্রীক বিলেতের উদ্দেশে পাড়ি জমান। গাফফার ভাই তাঁর ৮৮ বছর জীবৎকালের ৪৮ বছরই কাটিয়েছেন বিলেতে।
প্রায় চার দশক আগে সেন্ট্রাল লণ্ডনের ক্যামডেন টাউন হলে নাটক মঞ্চস্থ করতে গিয়ে গাফফার ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। তখনও আমি জনমতে যোগ দেইনি। ১৯৯০ সালে জনমতে যোগ দেয়ার পর গাফফার ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ তাঁর বাসায় আমি, আ স ম মাসুম, সাঈম চৌধুরী, জুয়েল রাজ ও আমার বন্ধু বাবলুল হক গিয়েছিলাম তাঁকে দেখতে। তখনই আমার সাথে তাঁর শেষ দেখা। তখন তিনি নিজ হাতে লিখে দিলেন আমাদের নতুন বই ‘বিলেতের বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থের ভূমিকা। আমরা সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম ব্রিক লেনের ক্যাফে গ্রিল থেকে বাংলাদেশি মাছ, ভর্তা ইত্যাদি খাবার। ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। মন ভরে খেয়েছিলেন সেসব খাবার।
প্রিয় গাফফার ভাই আর আমাদের মধ্যে নেই- এটা ভাবতেই মনটা কেমন করে ওঠে। পরম শ্রদ্ধেয় গাফফার চৌধুরী ছিলেন বাঙালি কমিউনিটির অন্যতম প্রাণপুরুষ। প্রজ্ঞা ও দিকনির্দেশনায় তিনি ছিলেন সাংবাদিকদের অভিভাবক। বাংলা সংস্কৃতির বাতিঘর গাফফার চৌধুরী মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত লেখে গেছেন অপশক্তির বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক ও আদর্শিক ভিন্নতার কারণে তাঁর লেখনী অনেকের পছন্দের ছিল না; তাদের কাছে ব্যক্তি হিসেবেও তিনি খানিকটা অপ্রিয় ছিলেন বটে। তা সত্ত্বেও কমিউনিটির সবাই তাঁর প্রতিভার প্রশংসা করতো।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী গাফফার চৌধুরী সাংবাদিকতার পাশাপাশি লিখেছেন বহু গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক ও গান। তাঁর এসব মৌলিক সৃষ্টিশৈলী বাংলা সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ। বহুগুণের অধিকারী এই ব্যক্তিত্বের চলে যাওয়ায় বাংলাদেশ ও বিলেতে বাঙালি কমিউনিটিতে যে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হলো তা সহজে পূরণীয় নয়। তিনি চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু যতদিন পৃথিবী টিকে থাকবে, বাংলাদেশ টিকে থাকবে, যতদিন বাংলা বর্ণমালা টিকে থাকবে ততদিন আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রগতিশীল বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন আলোকশিখা হয়ে। তার কালজয়ী অমর একুশের গানের মধ্য দিয়ে বিশ্ব বাঙালির মাঝে দেশপ্রেমের দ্যূতি ছড়াবেন তিনি।
গাফফার ভাই আমার রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় নন। ছিলেন আমার আত্মার আত্মীয়। তাঁর মৃত্যুর পর আমার মনের পর্দায় ভেসে উঠছে অসংখ্য স্মৃতি। মনে হয় আমি একজন বড় ভাই হারালাম, হারালাম এক পরমাত্মীয়কে। সাপ্তাহিক জনমতের হাত ধরেই আমার সাথে তাঁর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে।
গাফফার চৌধুরী বাঙালি জাতির গৌরব। অসাধারণ লেখনির গুণে পৃথিবীর প্রতিটি বাঙালির সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল নিবিড়। দীর্ঘ ৪৮ বছরে বিলেতের বাঙালি কমিঊনিটির অনেকেরই সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। তাই গাফফার চৌধুরীর তিরোধানের পর তাঁকে নিয়ে অনেকেই লেখবেন নিজেদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিচারণ।
গাফফার চৌধুরী ১৯৭৪ সালে বিলেতে আসার পর থেকেই সাপ্তাহিক জনমতে কলাম লিখতেন, ‘ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা’। অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি কলাম। এরজন্য জনমত কর্তৃপক্ষ তাঁকে সপ্তাহে ৫ পাউণ্ড সম্মানী দিতো। মাঝে কিছুদিন লেখেননি, সে কারণ আমার জানা নেই। তিনি বলেছেন, কর্তৃপক্ষের সাথে তাঁর একটু অভিমান ছিল। আমি এবং সৈয়দ সামাদুল হক (প্রাক্তন জনমত সম্পাদক, বাংলা টিভির চেয়ারম্যান) যখন জনমতের দায়িত্ব নেই (১৯৯০ সালে), আমরা তাঁকে আবারো লিখতে অনুরোধ করলে তিনি পুনরায় নতুন কলাম ‘তৃতীয় মত’ লেখা শুরু করেন এবং আমরা তাকে লেখার জন্য সপ্তাহে ২৫ পাউণ্ড সম্মানি দিতাম। তাঁর
লেখা এত জনপ্রিয় ছিল যে, কোনো সপ্তাহে যদি ভুলবশত বা কোন কারণে ছাপা না হতো তখন পাঠকরা ফোন করে আমাদের কাছে ব্যাখ্যা চাইতো, কেন আমরা তাঁর লেখা ছাপিনি। আবার কখনও কখনও বলতো, আপনাদের জনমত তো পড়ি শুধু উনার লেখার জন্য। জনমতের জনপ্রিয়তার একটা অন্যতম কারণ ছিল গাফফার ভাইয়ের কলাম। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিক জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র। কত হাজারো স্মৃতি তাঁকে ঘিরে। এককথায় সাপ্তাহিক জনমত গাফফার চৌধুরীর কাছে চিরকৃতজ্ঞ। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন। জনমত এই ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারবো না এবং জনমত পরিবারের প্রতি তাঁর ভালবাসার প্রতিদান দেয়ার ক্ষমতাও কারো নেই। আর আমিতো গাফফার ভাইয়ের কাছে চিরঋণী। আমার শরীরের প্রতিটি পশম তাঁর কাছে ভালবাসার কাছে ঋণী। তিনি যে আমাকে কতটা ভালবাসতেন তার একটি প্রমাণ হলো, ২০১৩ সালে আমি, প্রয়াত ইসহাক কাজল এবং ফারুক আহমদের অনুরোধে তিনি স্বাধীনতা পুরষ্কার ২০১৪ সালের জন্য জনমতকে মনোনীত করার আবেদন এবং প্রস্তাব পাঠান। তখন জনমত মনোনীত হয়নি।
তিনি আবারো অক্টোবর ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার ২০১৭ এর জন্য বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীপরিষদ বিভাগে আবেদন ও প্রস্তাব পাঠান। শুধু তাই নয়, আমাকে নিয়ে তিনি সরাসরি তখন স্বাধীনতা পদক কমিটির সদস্যদের সাথে কথা বলেছেন। তখন কমিটিতে সদস্য ছিলেন, রাশেদ খান মেনন, সৈয়দ মহসিন আলী, নুরুল ইসলাম নাহিদ, আবুল মাল আব্দুল মুহিতসহ অনেকেই। আমি যতদূর জানি, তখন সাপ্তাহিক জনমত প্রথম ধাপ পার হয়ে দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে পারেনি।
স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো, আমি জনমত ছেড়ে চলে আসি ২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে। আমার বিশ্বাস সাপ্তাহিক জনমত হয়তো একদিন স্বাধীনতা পুরস্কার পাবে। আগেই বলেছি, গাফফার চৌধুরী ১৯৭৪ সালে বিলেতে আসার পর আর স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য দেশে ফিরে যাননি । কিন্তু ১৯৭৫ সালে জুন মাসে দেশে গিয়েছিলেন কয়েক সপ্তাহের জন্য; তখনই তাঁর শেষ দেখা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে।
বিলেতে স্থায়ীভাবে টিকে থাকার জন্য, সংসার চালানোর জন্য তাঁকে লেখালেখির পাশাপাশি অন্য কাজও করতে হয়েছে। তিনি ওয়েস্টমিনস্টার কাউন্সিলের বাঙালি কমিউনিটির বিভিন্ন বাংলা স্কুলে বাংলা পড়াতেন এবং পাশাপাশি বাংলা অনুবাদের কাজও করতেন। দীর্ঘদিন তিনি পূর্ব লণ্ডনের কমার্শিয়াল রোডের হ্যানব্যারি স্ট্রীটের মোড়ে আনিস আহমদের মালিকানাধীন স্টার হোলসেল গ্রোসারিতে কাজ করেছেন। কিন্তু তাঁর নেশা ছিল সংবাদপত্র। তিনি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর লণ্ডনে ‘বাংলার ডাক’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। যদিও পত্রিকাটি বেশিদিন টিকেনি। সম্ভবত পত্রিকাটি বের হয়েছিল ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ সালে। তারপর তিনি এক ঝাঁক ব্যবসায়ীকে একত্র করে ১৯৮৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সাপ্তাহিক নতুন দিন, ১৯৯০ সালের ১৪ মার্চ সাপ্তাহিক নতুন দেশ এবং ১৯৯২ সালের ১০ জানুয়ারি সাপ্তাহিক পূর্বদেশ পত্রিকা বের করেন এবং সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তার হাতে ডা: মুর্শেদ তালুকদারের পাক্ষিক জাগরণ পত্রিকাটি সাপ্তাহিকে উন্নীত হয় এবং বিলেতে পত্রিকাটি বেশ সুনাম অর্জন করে।
গাফফার চৌধুরীর হাত ধরেই বাংলাদেশ ও বিলেতে সৃষ্টি হয়েছেন বহু সাংবাদিক। তিনি দিয়েছেন তাদেরকে অনুপ্রেরণা, দিয়েছেন শক্তি। আমার চোখের সামনে দেখেছি, তিনি ডেকে এনে বাঙালি ছেলে-মেয়েদের লেখায় এবং সাংবাদিকতায় উদ্বুদ্ধ করছেন। জনমত এর হাত ধরে এবং গাফফার চৌধুরীর সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আজ তারা দেশের প্রথম শ্রেণীর সাংবাদিক। তিনি তাদেরকে দেশের প্রথম শ্রেণির পত্রিকায় লেখার সুযোগও সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
গাফফার ভাইয়ের দ্বিতীয় বাসা ছিল সাপ্তাহিক জনমত অফিসের বেইসমেন্ট। তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার (অসুস্থ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত) প্রতি সপ্তাহেই দুপুরের দিকে জনমতে চলে আসতেন আর সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানেই থাকতেন। লাঞ্চ, চা-চক্র সবই ছিল এখানে। তিনি আসার পূর্বের দিন জনমতের অফিস ম্যানেজারকে ফোন করে বলতেন, আমার খামটা রেডি রেখো। এর অর্থ হচ্ছে- তাঁর লেখার সম্মানীটা যেন তৈরি থাকে। মাঝে মধ্যে খাম রেডি না থাকলেও মন খারাপ করতেন না, বলতেন একসাথে সবগুলো নেবো। বলতেন, নবাব তুমি পয়সা না দিলেও লেখবো, তুমি আমার দুর্দিনের বন্ধু-ভাই। মাঝে মধ্যে আমার কাছে সাহায্য চাইতেন, আমি তাকে সব সময়ই অতি আনন্দে নিজের ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে সাহায্য করেছি। বলতেন ফেরত দিয়ে দিবো, কিন্তু আমি তাকে ভালবেসেই সাহায্য করতাম, কখনও ফেরত চাইনি। তিনি বৃহস্পতিবারে আসার আগে সবার সাথে সাক্ষাৎস্থল হিসেবে জনমত অফিসকে ঠিক করে আসতেন।
সবাইকে বলতেন, জনমত অফিসের চলে আসার জন্য। কেউ আসতো প্রথমবারের মত দেখা করতো, কেউ আসতো সুপারিশের জন্য, আবার কেউ আসতো কোন তদবিরের জন্য। এসবের মধ্যে দু’ একটা অঘটনও ঘটেছে তদরীর করতে গিয়ে। দেখেছি নিজের চোখের সামনে সব ঘটনা, অনেক ঘটনার জীবন্ত সাক্ষী আমি। কাকে কীভাবে উপকার করেছেন, উপকার করতে গিয়ে তিনি ভাবীর বকাও খেয়েছেন অনেকবার। ভাবী জীবিত অবস্থায় প্রায়ই আমাকে ফোন করতেন। জনমত অফিস ছিল গাফফার ভাইয়ের আড্ডার জায়গা। গাফফার ভাইয়ের সুবাদেই আমার সাথে পরিচয় ঘটে শত শত অপরিচিত মানুষ, গুণীজন, সাহিত্যিক, নাট্যকার, নায়ক-নায়িকা ও রাজনীতিবিদের সাথে। এমনকি তাঁর অনুরোধে অনেক নবীন সাংবাদিক ছাত্রকেও জনমতে কাজ দিতে বাধ্য হই। এতে তারা উপকৃত হয়েছেন, সাথে জনমতও উপকৃত হয়েছে। মাঝে মধ্যে এমন কৌতুক বলতেন যা শুনে আমাদের হাসতে হাসতে গড়াগড়ি যাবার অবস্থা হতো।
আমি নাট্যচর্চা শুরু করি বিলেত আসার পর পুরাপোরিভাবে। ৮০’র দশকে আমি সেন্ট্রাল লণ্ডনে অনেকগুলো নাটক প্রযোজনা ও মঞ্চস্থ করি। তখন আমি সেন্ট্রাল লণ্ডনের সুরমা সেন্টারের সাথে জড়িত। প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বড় আকারে নাটক মঞ্চস্থ করার সুযোগ গাফফার ভাই সৃষ্টি করে দেন। আমাকে বলতে শুরু করেন, তুমি বড় আকারে মঞ্চ নাটক করো তাতে তোমার লাভ হবে। তাঁর অনুপ্রেরণায় আমি প্রথম ছোট মঞ্চ দর্শক বাদ দিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু করি এবং তিনি প্রথম আমার ‘নিউ হোম’ নাটকের নাট্যরূপ দেন। শুধু নাট্যরূপই দেননি, তিনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন নাট্যশিল্পী আবুল হায়াত ও বিপাশা হায়াতের সাথে এবং আমি সফলভাবে এই নাটকটি ১৯৯৬ সালে সেপ্টেম্বর মাসের ১২ তারিখ লগোন হলে, ১৭ তারিখ ও?হ্যামের কুইন এলিজাবেথ হলে এবং ২২ তারিখ বার্মিংহামের আস্টন ইউনিভার্টিতে মঞ্চস্থ করি। এই নাটকে বিপাশা হায়াত, আবুল হায়াত ছাড়াও বিলেতের স্থানীয় শিল্পী মাহফুজা তালুকদার, ইফাতারা খানম, মোস্তফা কামাল মিলন, শামিম চৌধুরী, ডা: আমিনা হোসেইন, হিরণ বেগ, ইকবাল বাহার, আমিনুল চৌধুরী বাবু, অরুল হালদার, মুকুল আহমদ, হাসি খান, স্বাধীন খসরু ও সিতু চৌধুরী অভিনয় করেন। এই নাটকের সফলতা বিলেতের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। নাটকটি পরিচালনা করেছিলেন খসরু নোমান এবং প্রযোজনা করেছিলেন মুহিব চৌধুরী, সৈয়দ নাহাস পাশা, সৈয়দ গোলাম দস্তগীর নিশাদ ও দানেশ আহমদ। প্রত্যেকটি হল ছিল দর্শকভর্তি এবং প্রতি হলে হাজারের বেশি দর্শক ছিল। হলে টিকেট না পেয়ে কালোবাজারে ১০০ পাউণ্ডের উপরে টিকেট বিক্রি হয়। তারপর গাফফার ভাই আমার একের পর এক অনকেগুলো নাটকের নাট্যরূপ দেন। তন্মধ্যে অনল, তারপর, ভালবাসা চাই, মরীচিকা ও সায়রা উল্লেখযোগ্য।
গাফফার ভাই আমাকে নাটকের মাধ্যমে বিলেতের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শীর্ষ অবস্থানে তুলে দেন। তার সেই অবদান ও ঋণ আমার রক্তবিন্দুতে মিশে আছে। তিনি আমার প্রতিটির বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন। গতকাল শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, আলতাব আলী পার্কে শেষ শ্রদ্ধা প্রদর্শনকালে টিভি ব্যক্তিত্ব আমার বন্ধু উর্মি মাজহার বললেন, বেশ কয়দিন আগেও নাকি গাফফার ভাই উর্মিকে বলেছেন, নবাবের খবর কী? উর্মির কথায় আমার চোখে জল চলে আসে, আমার হৃদয় গভীরভাবে স্পর্শ করে। আমার আম্মার মৃত্যুর পর ১৯৯৭ সালের জানুয়ারী মাসে গাফফার ভাই আমাকে ও আম্মাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন, ‘আমার মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে..’
আজও এই কবিতাটি যতœ করে রেখেছি। আম্মা নেই, গাফফার ভাইও আজ নেই। কবিতা স্মৃতি হয়ে আছে। একদিন আমি আমরা কেউই থাকবো না। শুধু থাকবে স্মৃতি। তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লেখা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। শুধু আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। আমি যখন সিদ্ধান্ত নিলাম জনমত ছেড়ে দেবো, তখন আমার সিদ্ধান্ত গাফফার ভাইকে বললাম। তিনি আমার কথা শুনে কয়েক মিনিট ছিলেন বাকরুদ্ধ। তিনি ভাবতেও পারেননি যে, আমি জনমত ছেড়ে দেবো। হাজারো আলাপ, অনেক গল্প, অগণন স্মৃতির আকর জনমত। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, তিনি সাঈম চৌধুরী সম্পাদিত ‘নবাব উদ্দিন : দ্বীপ্ত পথচলা’ বইটির ভূমিকা লিখলেন এবং আমাকে আশ্বস্ত করলেন যে, তিনি বেঁচে থাকলে আমার বিদায় অনুষ্ঠানে ২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে উপস্থিত হবেন। আমি শুধু হতবাক হইনি, পুরোদমে বাকরুদ্ধ ছিলাম, উনি হুইল চেয়ারে বসে ২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আমার বিদায় অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন। সেদিন ভালো করে উপলব্ধি হলো যে, এ মহান ব্যক্তিটি আমাকে কতটা ভালবাসেন। তিনি দীর্ঘ ৪ ঘন্টার পুরো অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং আমার বিদায়ী আবেগময় বক্তৃতা দেন। বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, “নবাব আমার ছোট ভাই, সে আমার বিপদে সব সময় আমার পাশে ছিল। তার কাছে আমি ঋণী, নবাব সত্যিকার অর্থে লণ্ডনের নবাব।” গাফফার ভাইয়ের কথাগুলি আমার কাছে অমৃত বাণী।
এক সময় আমার স্ত্রী ফৌজিয়া ওয়াহিদা ডলি গাফফার ভাইয়ের ‘তৃতীয় মত’ টাইপ করে দিতেন জনমতের জন্য। আমার ছোট ছেলে নাবহানকে কোলে নিয়ে। তখন গাফফার ভাই বলতেন, তোমার বউকে কষ্ট না দিয়ে একটা লোক জনমতের জন্য রাখো। আর কত কষ্ট দিবে, সে বাচ্চা কোলে নিয়ে টাইপ করে। তখন জনমতের সেই সামর্থ্য ছিলনা অতিরিক্ত লোক নিয়োগ করার। তাঁর সেসব কথাই আজ অমূল্য স্মৃতি।
যতদিন বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ, বাংলা বর্ণমালা টিকে থাকবে ততদিন আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রগতিশীল বাঙালির মধ্যে বেঁচে থাকবেন, বেঁচে থাকবে তাঁর রচিত অমর একুশের কালজয়ী কবিতা/গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি..।” অগ্রজ প্রতীম গাফফার ভাই ওপারে চলে গেছেন, আর ফিরে আসবেন না। তিনি আজ চিরনিদ্রায় শায়িত।
প্রিয় গাফফার ভাই, এখন আর আপনার কাছে যেতে পারবো না, আর আপনাকে আমার নাটকের নাট্যরূপ, আমার নতুন বইয়ের ভূমিকা আর স্বাধীনতা পুরস্কারের আবেদনের অনুরোধ করে বিরক্ত করতে পারবো না। আর কেউ অনুযোগ করে আমাকে বলবে না যে, আমি বিভিন্ন ইস্যুতে আপনাকে শে?ার দেই। আপনার জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল মানবতার মুক্তি ও সাহিত্যের সেবা করা। আমরা বিলেতবাসী প্রগতিশীল বাঙালি সত্যিই সৌভাগ্যবান যে আপনাকে কাছে পেয়েছিলাম। আপনি ছিলেন প্রতিটি মানুষের আবদারের স্থান। অনন্যসাধারণ প্রজ্ঞায় আপনি উজ্জ্বল করেছেন বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতাকে, আপনি আলোকিত করেছেন বিলেতের সাংবাদিক জগত এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে। আপনার অনুপস্থিতির এই শূন্যতা কখনও পূরণ হবে না। দোয়া করি, মহান রাব্বুল আলামীন যেন আপনাকে ক্ষমা করেন, জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করে সেথায় চিরশান্তিতে রাখেন। আমিন।
 লণ্ডন, ২১শে মে ২০২২।
 লেখক: সাবেক সম্পাদক, সাপ্তাহিক জনমত এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট, লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব, নাট্যকার।

গাফফার ভাই স্মরণে
রাজন উদ্দিন জালাল

১৯ মে সকালে সাড়ে ৯টার দিকে বন্ধু আতিক হাসান ভাইকে নিয়ে রেডব্রীজের গ্যান্টসহীলে আমার বাসা থেকে রওয়ানা দিয়েছিলাম আমার মেয়ে নাজিয়াকে গ্যাটউইক বিমান বন্দরে পৌঁছে দিতে। এম টুয়েন্টিফাইভ ধরে চলছি। ডার্টফোর্ড সেতুর কাছে পৌঁছানোর আগে ফেইসবুক খুলতেই দেখলাম আমাদের সমাজের এক কিংবদন্তী সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী আর নেই। ইন্নালিল্লাহি ও ইন্নাইলাহি রাজিউন। তাঁর বয়স হয়েছে এবং বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের রোগে বেশ ভুগছিলেন সেটি জানতাম। তারপরও প্রিয়জনের চিরবিদায়ের খবরে মনটা বিষণœ হয়ে গেলো।   
গত ১৭ মে, সন্ধ্যা সাড়ে আটটার দিকে ফোন দিয়েছিলেন আলতাব আলী ফাউণ্ডেশনের সভাপতি নুরুদ্দিন আহমদ। তিনি আমার এবং গাফফার ভাইর দুজনেরই খুব কাছের মানুষ। সদ্য সমাপ্ত (৫ মে ২০২২) টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে নানা আলাপের এক পর্যায়ে তিনি গাফফার ভাইয়ের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি কথা জানালেন। তবে বললেন, পরিবারের বাইরে কাউকে দেখতে দেয়া হচ্ছে না। আরো জানালেন যে, সাথী সহকর্মীর সকলের নাম ধরে তিনি এক এক জনের খবরাদি নিচ্ছিলেন।
নূরের মত আমাকেও গাফফার ভাই হঠাৎ করেই ফোন করেছিলেন গত জানুয়ারি মাসে। নিজে থেকে হঠাৎ একদিন রাতে আনুমানিক ৯টার দিকে ফোন করে শুধু আমার শারীরিক অবস্থার খবরই নেননি (হয়ত তিনি জানতেন যে আমার কোভিড হয়েছিল এবং পরে হালকা হার্ট এ্যাটাকও হয়েছিল) বরং আমাদের পুরাতন সাথী-সহকর্মী অনেকের নাম ধরে ধরে তাদের কুশল জানতে চাইলেন। তাঁর স্মরণশক্তি খুবই ভাল ছিল।
তাঁর সাথে আমার শেষ দেখা ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে। আমরা মিলিত হয়েছিলাম পূর্ব লণ্ডনের মাইলএণ্ড রোডের প্রাইড অফ এশিয়া রেস্টুরেন্টে। সেখানে তাঁর এবং আমার দুজনেরই আরেক বন্ধু কাজী নাজিম উদ্দিনের ঢাকাস্থ উত্তরার প্লট এবং দালান জবরদখল থেকে উদ্ধারের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। শারীরিক অবস্থার কারণে তিনি দেশে যেতে পারবেন না, তাই তিনি আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন নাজিম ভাইকে সাথে নিয়ে দেশে গিয়ে?বিষয়টি নি?ত্তির। গাফফার ভাইয়ের সাথে আর সশরীরে দেখা হলো না এই আফসোস থেকেই গেলো।
গাফফার ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৮০ সালের প্রথম দিকে। তখন তিনি নিয়মিত পূর্ব লণ্ডনে আসতেন এবং প্রায় সময় তাঁর সফরসঙ্গী থাকতেন প্রয়াত তাসাদ্দুক ভাই। তখন গাফফার ভাই একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। আমাদের সাথে চলাফেরা এবং মেলামেশার মাধ্যমে গাফফার ভাই অনেকের পারিবারিক বন্ধু হয়ে যান। তিনি একজন সদালাপি, বন্ধুসুলভ ভদ্রলোক ছিলেন।
তখনকার সময় আমাদের আড্ডাখানা ছিল বর্তমানের বাংলাটাউনস্থ হ্যানবারী স্ট্রিট ও ডিল স্ট্রিটের কোনার কমিউনিটি হল মন্টিফিউরি সেন্টার। এই আড্ডাখানা ছিলো বাংলার অসাধারণ শিল্পী মান্নার দে’র গাওয়া গানের ‘কফি হাউসের’ আড্ডাখানার মত। শুধু পার্থক্য ছিল মন্টিফিউরি সেন্টারের আড্ডাখানাতে সবাই জড়ো হতেন সকালে নাশতার সময় থেকে, বিকেলে নয়। বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন ‘দি ব্যাটল অব ব্রিকলেইন ৭৮’-এর সমাপ্তির পরে এবং ‘দি হোম এফেয়ার্স সিলেক্ট কমিটির রিপোর্ট ওন বাংলাদেশীজ’ প্রকাশিত হবার পর বাঙালিদের জন্য এদেশের এ্যাস্টাবলিস্টমেন্ট এবং বিভিন্ন জন প্রশাসনিক সংগঠনের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং বহু ধরণের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি হতে শুরু করে। তখনকার সময় আমাদের বন্ধু ডি বাউল নামে এক মহিলা শিক্ষা বিস্তারের দায়িত্বশীল হিসেবে মন্টিফিউরি সেন্টারে ডাইরেক্টর নিযুক্ত ছিলেন এবং তাঁরই সহায়তায় আমরা এই সেন্টারে বিভিন্ন ধরণের সভা-সমিতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সেমিনার/কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হত। এক পর্যায়ে স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সাহায্য আদায় করে আমরা মন্টিফিউরি সেন্টারকে আমাদের সামাজিক সংগঠনের কারখানা অথবা ‘হাব’ হিসাবে গড়ে তুলি। এই মন্টিফিউরি সেন্টারেই আমরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং কমিউনিটি রাজনীতির সংগঠন গড়ে তুলি। এখানেই পূর্ব লণ্ডনের প্রথম ২১শে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান হয়েছিল। এসবের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হল- জুনেদ ভাইয়ের ক্যান্টিন, প্রগ্রেসিভ ইয়থ অর্গেনাইজেশনের ক্লাব এবং অফিস, এশিয়ান আনএমপ্লয়মেন্ট প্রজেক্টের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, স্প্রিবোর্ড ট্রেনিং সেন্টার এবং অফিস, ফেডারেশন অব বাংলাদেশী ইয়থ অর্গানাইজেশনের (এফবিওয়াইও) এর ‘যুববার্তা’ ম্যাগাজিনের কেন্দ্র, বাংলাদেশী এডুকেশনাল নিডস ইন টাওয়ার হ্যামলেটস ‘বেনথ’-এর অফিস ও কেন্দ্র।
উপরেল্লেখিত সংগঠনগুলোর মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছিল বাঙালিদের মৌলিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং সৃষ্টি হয়েছিল বিভিন্ন ধরণের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ-সুবিধা। এই সংগঠনগুলোর সফলতার কারণে বাঙালি শত শত লোক মূলধারার বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ, পেশাদারি চাকুরি এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন। আমাদের সৌভাগ্য হয়েছিল গাফফার ভাইয়ের মত একজন কিংবদন্তী সাংবাদিককে আমরা ‘বেনথ’-এর সমন্বয়কারি হিসাবে তৎকালীন ‘ইনার লণ্ডন এডুকেশন অথরিটি’ আই এল-এর অফিসার হিসাবে নিয়োগ দিতে পেরেছিলাম। বেনথ-এর মাধ্যমে আমরা সক্ষম হয়েছিলাম পেশাদার সেক্টরগুলোতে বাঙালিদের জন্য বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ প্রজেক্টের মাধ্যমে চাকরির সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করতে। জার্নালিজম প্রশিক্ষণ, মূলধারায়?স্যোসাল ওয়ার্কার নিয়োগ, বেনথ বুলেটিন (শিক্ষাবিষয়ক ম্যাগাজিন) প্রকাশ- এসব অর্জনে আমাদের সহযোগী, বুদ্ধিদাতা এবং প্রেরণা ছিলেন তাসাদ্দুক আহমদ, ফখরুদ্দিন আহমদ ও গাফফার ভাই। তবে আমাদের প্রগতি এবং উন্নয়ন টাওয়ার হ্যামলেটসের নতুন রাজনৈতিক প্রশাসনের সহ্য হয়নি।
লিবারেল ডেমোক্রাট স্থানীয়ভাবে যখন তাদের বর্ণবাদি নীতিমালা নিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখন তারা বাঙালিদের গৃহহীন পরিবারদের শুধু টেমস নদীতে একটি জাহাজে স্থানান্তরিত করার প্রস্তাবে সীমিত থাকেনি- তারা বাঙালি সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন বাতিল করে এবং মন্টিফিউরি সেন্টারে অবস্থিত ক্যাম্পেইনিং সংগঠনগুলো বন্ধ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে এই সেন্টারটিকে বন্ধ করে দেয় এবং পরবর্তীতে বেথনালগ্রীন ট্রেনিং সেন্টার হিসাবে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করে। এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী ছিলেন বর্ণবাদি হিসাবে পরিচিত তৎকালীন লিবারেল ডেমোক্রাট লিডার কাউন্সিলার জেরেমি শো। তাই বর্তমানে মন্টিফিউরি সেন্টারে বসে না সেই কফি হাউসের আড্ডা এবং নেই তখনকার সেই কফি হাউসের আড্ডার সমাজ সচেতন নেতৃবৃন্দ অথবা বাঙালির নেতৃত্বাধীন সংগঠন। ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে আমাদের সামাজিক সংগঠনগুলোর মেরুদণ্ড। এরপরে জন বিগস সাহেব কাউন্সিলের নেতা হন এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত নির্বাহী মেয়রও। তিনিও ঐতিহাসিক কারণে বাঙালি ভলেন্টারি সেক্টরের মাধ্যমে গড়ে ওঠা লেবার পার্টিতে যোগদানকারী বাঙালি একটিভিস্টদের সহ্য করতে পারেননি এবং পরিকল্পিতভাবে আর্থিক অনুদান আনুমানিক ৭৫% কমিয়ে দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছেন বাঙালি সংগঠনগুলোকে। তাছাড়া অর্থের অভাবে এখন বিভিন্ন সেন্টারে তালা ঝুলছে নতুবা তাদের বাতি জ্বালাবার অর্থ নেই।
আমরা যুব সমাজের একটিভিস্টরা যখন মূলধারার রাজনৈতিক কাজে যোগ দিতে লেবার পার্টিতে তৎপর হই মধ্যে তখন আমাদেরকে উপদেশ ও উৎসাহ দিতেন গাফফার ভাই এবং তাঁর সহকর্মী জ্ঞানী-গুণীরা। আমি যখন প্রথম লেবার প্রার্থী হিসাবে তখনকার সেইন্ট ক্যাথরিন ওয়ার্ড (টাওয়ার হ্যামলেটস) থেকে নমিনেশন পেয়েছিলাম তখন ডানপন্থী এবং বর্ণবাদি এক চক্র জন বিগসের নেতৃত্বে (আমাদের বাঙালি কয়েকজনের সহযোগিতা নিয়ে) পার্টির মেম্বারশীপ লিস্ট অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে ভোটে আমাকে পরাজিত করান। তখন বাঙালি নেতৃত্বের পক্ষে আওয়াজ তুলেন ‘দেশবার্তা’ পত্রিকার গাজিউল হাসান খান ‘ব্রিকলেইন থেকে বলছি’। এগিয়ে আসেন আমাদের সমর্থনে জনমত পত্রিকার কাদের মাহমুদ ও সৈয়দ সামাদুল হক (পরে বাংলা টিভি), ‘জাগরণ’ পত্রিকার মুর্শেদ তালুকদার এবং তাঁর ইংলিশ পত্রিকা ‘দি এশিয়ান হেরা?’-এর ইকবাল ওয়াহাব। সে সময় আমাদের মধ্যে আস্থার অভাব ছিল এবং অনেকে বলে বেড়াতেন যে বাঙালিরা যোগ্য নন। এদের জবাবে ভূমিকা নেন কিংবদন্তী সাংবাদিক গাফফার ভাই। তাঁর সম্পাদিত ‘নতুন দিন’ পত্রিকায় তিনি দুঃখ করে লিখেন- কিথ ভাজের মত মানুষ যদি এমপি হতে পারে তাহলে আমাদের সমাজের লোকেরা কেন এমপি ও মন্ত্রী
হতে পারে না। এই ধারাবাহিকতায় গাফফার ভাই ‘নতুন দিন’ পত্রিকায় এক সংখ্যায় আমিসহ কয়েকজনকে এমপি হওয়ার উপযুক্ত বলে ঘোষণা দেন। আমি সৌভাগ্যবান যে, এক পর্যায়ে গাফফার ভাই আমাকে ‘তৃতীয় বাংলা’র মুজিব’ উপাধি দিয়েছিলেন। তবে আমি রাজনৈতিকভাবে গাফফার ভাইয়ের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে পারিনি। কারণ এ্যাস্টাবলিস্টমেন্টের মদদপ্রাপ্ত মুখচেনা বর্ণবাদি এবং ডানপন্থী দালালরা আমার এবং বাঙালিদের অগ্রযাত্রাকে ধ্বংস করে দেন। তবে সমাজ এবং জনগণ অন্ধ নয় এবং তারই প্রতিফল হিসাবে টাওয়ার হ্যামলেটসের দুই যুগ থেকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাক্ষী আমরা সবাই।
কিভাবে মূল্যায়ন করব আমরা গাফফার ভাইকে? ব্যক্তিগতভাবে তিনি সদালাপি, বন্ধুসুলভ এবং ভদ্র একজন মানুষ। সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে তিনি স্পষ্টবাদী। তিনি যা ভাবতেন, তাই করতেন।
প্রথম জীবনে, রোগগ্রস্ত স্ত্রীকে নিয়ে অনেক কষ্ট করেছেন। অর্থকড়িরও অভাব ছিল। এক সময় তিনি বাংলা টাউনের হ্যানবারি স্ট্রিটস্থ (কমার্শিয়াল স্ট্রিটের কোনায়) অবস্থিত স্টার ক্যাশ এণ্ড ক্যারি’তে চাকরি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে সবকিছুর উপরে ছিলো তাঁর ‘মুজিবভক্তি’। বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে তিনি অনড় ছিলেন।
যত দিন রবে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও সুরমা বহমান ততদিন আমাদের ভবিষ্যত বংশধররা ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানের রচয়িতাকে তাদের অন্তরে, হৃদয়ের মনিকোঠায় রাখবে শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরীকে।
লণ্ডন, ২০ মে, ২০২২।
লেখক: কলামিস্ট, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, প্রাক্তন কাউন্সিলার ও টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি লিডার ও রিজেনারেশন কমিটির চেয়ারপারর্সন এবং প্রাক্তন এলডিডির ডাইরেক্টর।

গাফ্ফার ভাই ছিলেন জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া
নিলুফা ইয়াসমীন

অষ্টাশী বছরেও স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর, বড় বড় কবিতা মুখস্ত আওড়িয়েছেন, পৃথিবীর সকল প্রান্তের খবর ছিল নখ দর্পণে, তাঁকে ‘এনসাইক্লোপিডিয়া’ বললেও অত্যুক্তি হবেনা। হুইল চেয়ারে বসেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন, চমৎকার বক্তব্য রেখে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। আজ সবই অতীত। বিনম্র শ্রদ্ধা! প্রিয় গাফ্ফার ভাই।
স্কুল জীবনে কবিতা লেখা শুরু, কলেজে ছাত্র থাকাকালীন সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি, মুক্তিযুদ্ধের কলম সৈনিক সারা জীবন সোচ্চার থেকে জীবন থেকে হারিয়ে গেলেন গাফ্ফার ভাই। বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট, সাহিত্যিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সাংবাদিকতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, স্মৃতি কথা, ছোটদের উপন্যাসসহ প্রায় ৩০টির মত বই লিখেছেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস হল ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’। সব কিছু ছাড়িয়ে অমর হয়ে থাকবেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ কালজয়ী গানটি লেখার জন্য।
বাংলাদেশে থাকাকালীন সময়ে আশির দশকের শেষের দিকে গাফ্ফার ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। সেই সময়ে তিনি ভাবীকে (সেলিমা আফরোজ) নিয়ে লণ্ডন থেকে বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়েছিলেন। আমার জীবন সাথী সাংবাদিক আবু মুসা হাসান গাফ্ফার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যাবেন শুনে আমিও জনপ্রিয় কলামিস্ট সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে দেখার লোভ সামলাতে পারলামনা। হাসানের সাথে আমি গাফ্ফার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম তাঁরই এক আত্মীয়ের বাসায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আরেক গুণী ব্যক্তি গাফ্ফার ভাইয়ের কাজিন কবি আসাদ চৌধুরী।
অনন্য মাত্রার দুই কিংবদন্তি সাহিত্যিকের মজাদার আড্ডা তখন মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম। বাসায় শাশুড়িমায়ের কাছে ছোট দুটি বাচ্চা রেখে গিয়েছি। ক্রমে রাত বাড়ছে, আমার সঙ্গী বারবার আমাকে তাড়া দিচ্ছেন বাড়ি ফেরার জন্য। কিন্তু আমি এতোটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম তাঁদের আলাপনে, উঠার তাগিদ অনুভব করছিলাম না। অনিচ্ছাসত্ত্বে¡ও মজার আড্ডা ছেড়ে সেদিন উঠতে হলো।
দু’হাজার সালে লণ্ডন আসার পর গাফ্ফার ভাইয়ের বাসায় গিয়েছি, তিনি এসেছেন আমাদের বাসায় বহুবার। ঢাকা থেকে কোন পরিচিত জন বিশেষ করে সাংবাদিকরা আসলেই গাফ্ফার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে চাইতেন। তাঁদের আগমন উপলক্ষে আমাদের বাসায় সব সময়ে গাফ্ফার ভাই আর আমাদের আরেকজন শ্রদ্বেয় প্রিয়জন সাংবাদিক প্রয়াত আমিনুল হক বাদশাহ ভাই অতিথি হয়ে আসতেন। আমার দুই ভাসুর সাংবাদিক এন এম হারুন এবং জামাল হাসান গাফ্ফার ভাই এবং বাদশা ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সেই সুবাদে তাঁরাও ছিলেন আমার ভাসুর তূল্য ।
সাপ্তাহিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন গাফ্ফার ভাই। ’বিলাতের আয়নায়’ শিরোনামে গাফ্ফার ভাইয়ের ধারাবাহিক কলাম পাঠকের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিল, সমসাময়িক ঘটনা গল্পের মত করে তুলে ধরতেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক কলাম লিখতেন। তৎকালীন পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ নাহাস পাশার অনুরোধে গাফ্ফার ভাই পত্রিকার একুশে সংকলনের জন্য আরো একটি কালজয়ী কবিতা লিখেছিলেন, যা পত্রিকার আর্কাইভ খুঁজলেই পাওয়া যাবে।
গাফ্ফার ভাই ঢাকার বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিনই কলাম লিখতেন। এত বড় বড় লেখা হাতে লিখতেই তিনি স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। সাপ্তাহিক পত্রিকা তখন প্রতি সপ্তাহে সোমবারে প্রকাশিত হতো, রোববার রাতে প্রেসে যেতো। শনিবারে ফ্যাক্স এর মাধ্যমে গাফ্ফার ভাইয়ের লেখা পাঠানোর সময় নির্ধারিত ছিল। অনেক সময়ে রোববার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আমার অন্যান্য সহকর্মী এবং পত্রিকার বার্তা সম্পাদক হিসেবে আমি শনি, রোববার গাফ্ফার ভাইয়ের বাসায় ফোন করে লেখা কখন পাবো খবর নিতাম। তবে, প্রায় অধিকাংশ সময়ে ফোন ধরতেন সেলিমা ভাবী।
ভাবীর ব্যবহার ছিল খুবই চমৎকার। ফোন ধরে এতটা অমায়িকভাবে কথা বলতেন যা ভুলতে পারিনা। কুশল বিনিময়ের পর খুবই মায়া করে বলতেন, ‘মা কেমন আছে’, আমার আম্মার কথা তিনি জানতে চাইতেন, এমনভাবে বলতেন যেন তিনি তাঁর মায়ের খবর জানতে চাচ্ছেন। আজও ভাবীর সেই মধুরকণ্ঠ কানে বাজে। আমি পত্রিকায় ‘ঘর মন জানালা‘ নামে পাঠকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতাম। সেই লেখা ভাবীর খুব পছন্দের ছিল, আলাপে উল্লেখ করতেন।
একবার ঢাকা থেকে বিশিষ্ট সাংবাদিক প্রায়ত এ বি এম মুসা লণ্ডনে বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি আমাদের বাসায় ছিলেন কিছুদিন। মুসা ভাইয়ের সম্মানে আমাদের বাসায় অনেককে নিমন্ত্রণ করেছিলাম। মুসা ভাইয়ের ঘনিষ্ঠজন গাফ্ফার ভাইও অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। পরবর্তীতে আমাদেরকেসহ গাফ্ফার ভাই তাঁর বাসায় মুসা ভাইকে দাওয়াত করেছিলেন। ভাবী অসুস্থ ছিলেন তাই আমি রান্না করে নিয়ে গিয়েছিলাম। গাফ্ফার ভাই বললেন, তুমি রেঁধে এনেছো কেন, দুই মুসার জন্য তোমার ভাবী কত পদ রেঁধেছে দেখ, আমি ইস্ট লণ্ডন থেকে ইলিশ মাছ আর পুঁই শাক নিয়ে এসেছি। সেদিন ইলিশ মাছ দিয়ে পুঁই শাক মজা করে খেলাম।
ভাবী হুইল চেয়ারে বসেই রান্না ঘরে কাজ করছিলেন। আমি কাজে সাহায্য করতে চাইলে তিনি অনুমতি দেননি। ভাবী আমাকে তার বাসার বাগান দেখিয়ে বললেন, হুইল চেয়ারে বসে বাগান পরিচর্যা করেন। খুবই গুণী একজন মানুষ ছিলেন ভাবী। গাফ্ফার ভাইয়ের সকল ছাপার লেখা ভাবী যতœসহকারে গুছিয়ে রাখতেন।
গাফ্ফার ভাইয়ের স্মরণ শক্তির কথা আগেই উল্লেখ করেছি, ইতিহাস ছিল তার ঠোঁটস্থ। তারপরও কোন কিছু জানতে তিনি বিভিন্ন জনের কাছে ক্রস চেক করতেন। মাঝে মাঝে হাসানকে ফোন করে কোন বিষয়ে জানতে চাইতেন। অনেক সময়ে হাসান উত্তর দিতে দেরী করলে বলতেন, নীলুকে দাও। আমার মত একজন নগণ্য ব্যাক্তির কাছে গাফ্ফার ভাই কোনো তথ্য যাচাই করতে চায় শুনে আমি অপ্রস্তুত হয়ে যেতাম।
সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে গাফ্ফার ভাই মাঝে মাঝে আসতেন। বিশেষ করে সামাদ ভাই (পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আহমেদ উস সামাদ চৌধুরী জেপি) বাথ থেকে লণ্ডন এসেছেন শুনলে গাফ্ফার ভাই আসতেন। আমাদের আড্ডার মধ্যমণি থাকতেন গাফ্ফার ভাই। অধীর আগ্রহে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনতাম সবাই।
বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা হতো গাফ্ফার ভাইয়ের সাথে। সত্যবাণীর সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশার বাসায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাফ্ফার ভাই সব সময়ে আসতেন। আমরাও অতিথি হিসেবে সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতাম। গাফ্ফার ভাই তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার থেকে গল্প করতেন। অনেক অনুষ্ঠানে গাফ্ফার ভাইয়ের বড় বড় কবিতা মুখস্থ আবৃত্তি শুনে অবাক হয়ে যেতাম।
কুশল জানার জন্য ফোনে কথা হলেই গাফ্ফার বলতেন বাসায় আসো। সব সময়েই বলেছি আসবো, কিন্তু গত দু’বছর যাওয়া হয়নি।
আগে যতবার গাফ্ফার ভাই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গিয়েছেন, প্রায়ই হাসপাতালে যেয়ে দেখে এসেছি। তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকলেও মনের জোর ছিল প্রবল। কথা বললে মনেই হতোনা তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ নন।
কয়েকদিন আগে মুক্তিযোদ্ধা লোকমান ভাইকে বলেছিলাম, গাফ্ফার ভাই হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরলেই দেখতে যাব। বাসায় যেয়ে গাফ্ফার ভাইকে আর দেখা যাবেনা। শুক্রবার আলতাব আলী পার্কে কফিন বন্দি অবস্থায় শেষবারের মত গাফ্ফার ভাইকে দেখলাম। সামনাসামনি দেখতে না পেলেও আমাদের হৃদয়ে গাফ্ফার ভাই চির জাগরুক থাকবেন।
লণ্ডন, ২২শে মে ২০২২
লেখক: বার্তা সম্পাদক সত্য বাণী। সাপ্তাহিক পত্রিকার সাবেক বার্তা সম্পাদক।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কলম
সাঈম চৌধুরী

আটাশি বছর কী প্রবলভাবে তিনি বেঁচে ছিলেন!
চল্লিশ পেরুলে নাকি চালসে, পঞ্চাশে মগজে মরচে আর ষাট পেরুলে স্মৃতির প্রতারণা। অধিকাংশ সৃষ্টিশীল মানুষ ষাটের ঘাটে পৌঁছে ক্ষয়ে যেতে থাকেন। ম্রিয়মান হতে থাকেন। তাদের অনেকেই হয়তো অশীতিপর হোন, তবে ওটা কেবল রুটিন শ্বাস-প্রশ্বাস। এমন কারো মৃত্যুতে যখন আমরা শোক জ্ঞাপন করি, প্রকৃতপক্ষে সেটি আরও দশ পনেরো বছর আগের তাঁর ক্রিয়াশীল সময়ের স্মৃতিচারণা। সবার পক্ষে জীবন নিংড়ে পুরোটা রস আস্বাদন সম্ভব হয় না। অতি অল্প সংখ্যক মানুষ সেটি পারে।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ছিলেন সেই অতি অল্প মানুষের দলে। আটাশি বছরে মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন পুরোমাত্রায় সৃষ্টিশীল। মননে মগজে তখনও তিনি পরিপূর্ণ তরুণ। কী বিস্ময়কর স্মরণশক্তি! যেনো ইতিহাস তাঁর কাছে বশ মেনে ছিলো। নিজ চোখে দেখা অতীতকে পোষা পাখির বুলির মতো তিনি আশ্চর্য দক্ষতায় আত্মস্থ করে রেখেছিলেন। আর এ কারণে জীবনে তেমন করে শ্রেণিকক্ষে ক্লাস না নিয়েও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইতিহাসের শিক্ষক। গভীর মমতায় জীবনভর গোটা জাতিকে তিনি ইতিহাসের পাঠ শিখিয়েছেন। সবচেয়ে স্বস্তির কথা হচ্ছে, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর জিম্মায় থাকা বাংলাদেশের ইতিহাস কখনও দিকভ্রান্ত হয়নি। আর এ কারণে বাংলাদেশ তাকে মনে রাখবে। বহু অজানা ইতিহাস, উপাখ্যান জানতে জাতি তাঁর লেখার ভাণ্ডারে চোখ রাখবেই।
এভাবেই বাংলা নামের রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সেখান থেকে তাঁকে আলাদা করা যাবে না কখনো।
বেঁচে থাকতে অমরত্ব নিশ্চিতের সৌভাগ্য পৃথিবীর খুব কম মানুষের জুটেছে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ছিলেন সেই বিরল মানুষের কাতারে। অথচ এমন অপার সৌভাগ্যে তিনি কখনো গরিমায় ভোগেননি। অসাধারণ হয়েও তিনি সাধারণের কাছাকাছি ছিলেন, পাশাপাশি ছিলেন।
বিলেতে বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সখ্যতা ছিলো জবরদস্ত। যারা তাঁর কাছে যেতে চেয়েছেন, তাদের তিনি ঠিকই কাছে টেনে নিয়েছেন। যাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন, তাদের হাড়ির খবর পর্যন্ত রেখেছেন।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মৃত্যুর পর গত দুইদিনে ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ঘুরে দেখি কতজনের কত কত স্মৃতি। প্রতিটি স্মৃতিকথা আলাদা আলাদা পরখ করে দেখি, একান্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সাক্ষ্য। কী গভীরতর যোগাযোগ! একজন মানুষ কীভাবে এতজনের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে জানেন?
না, এটা ভান ছিলো না। এটা ভনিতা ছিলো না। এটা ছিলো একজন হৃদয়খোলা লেখকের সর্বসাধারণে বিস্তৃত হবার আশ্চর্য ক্ষমতা।
শুক্রবার যখন শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মরদেহ আলতাব আলী পার্কের শহীদ মিনারে আনা হলো তখন আমি সেখানে ছিলাম। তখন আমি অনেক চোখে জল দেখেছি। যারা কান্না করছিলেন তাদের কেউ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর আত্মীয় ছিলেন না। তাদের কারো সঙ্গে ছিলো না তাঁর রক্তের বন্ধন। তবু তিনি তাদের সঙ্গে বেঁধেছিলেন প্রাণ সুরের বাঁধনে। আর তারা তাঁকে পেয়েছিল অজানা এক সাধনে।
আলতাব আলী পার্কের শ্রদ্ধা জানানোর সে ভিড়ে একজন অজানা অচেনা যুবক হঠাৎ করে আমার সমগ্র মনোযোগ কেড়ে নেন। তাঁকে আগে কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না। যুবক কফিনের কাছে যেতে বেশ মরিয়া। ভিড়ের কারণে বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। আমি তাকে খুব কাছ থেকে অনুসরণ করি। এক সময় ভিড় কিছুটা হালকা হয়ে আসে। যুবক কফিনের কাছে যাবার সুযোগ পান। তারপর নাটকীয়ভাবে পুরোদস্তুর মিলিটারি কায়দায় কফিনের দিকে তাকিয়ে স্যালুট করেন তিনি। যুবকের চোখ ভেজা মনে হয়। জানতে চাই, খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন বুঝি?
যুবক বলেন, অনেক ইচ্ছে ছিলো তবু কখনো তাঁর সাথে দেখা হয় নি।
না দেখেও এমন বিনম্র শ্রদ্ধা, এমন গভীরতর অনুরাগ, এটাও সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব। কারণ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর হাতে ছিলো এক জাদুর কলম। আশ্চর্য তার শক্তি। অসীম তার প্রাণ। এমন কলমের কারিগরকে একবারই পায় পৃথিবী, তারপর আর পায় না কিছুতে...
লণ্ডন, ২০শে মে, ২০২২
লেখক: সাংবাদিক, গল্পকার

আবদুল গাফফার চৌধুরী আমাকে নামে চিনতেন
আ স ম মাসুম

আমার বিশেষ সৌভাগ্য যে, আমি প্রয়াত সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী ও প্রয়াত সাংবাদিক আমিনুল হক বাদশাহের সান্নিধ্য ও স্নেহ পেয়েছিলাম। সবাই যখন গাফফার ভাইয়ের শেষ বিদায়ে মাতম করছেন তখন আমি প্রকৃতির খেলা দেখছিলাম। বয়সে অনেক ছোট গাফফার ভাইয়ের প্রিয়জন বাদশাহ ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর শেষ বিদায়ের দিনে বৃষ্টি হয়েছিলো। কী আশ্চর্য! ২০ মে আবদুল গাফফার চৌধুরীর বিদায়ের দিনও ঠিক এভাবেই বৃষ্টি নেমেছে!
গাফফার ভাই বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকাটি পছন্দ করতেন। লিখতেন বিশেষ সংখ্যাগুলোয়। সর্বশেষ ১৫ মার্চ বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে লিখেছেন। মন খুলে প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের।
২০১৮ সালে ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রকাশনা শুরুর কালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পত্রিকার মোড়ক উন্মোচনের গাফফার ভাইয়ের বিকল্প আমরা চিন্তাও করতে পারিনি, অনুষ্ঠানে গাফ্ফার ভাই এলেন হুইল চেয়ারে করে। সে অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম, লণ্ডনের মেয়র, লণ্ডনের বাংলা মিডিয়ার শীর্ষ পর্যায়ের সবাই উপস্থিত ছিলেন। গাফ্ফার চৌধুরী বলেছিলেন, বাংলাদেশ প্রতিদিন বাংলাদেশে সর্বাধিক প্রচারিত। এখন লণ্ডন ও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশ করে নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে সংবাদপত্রের জগতে। এ ইতিহাস সবাই সৃষ্টি করতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক আদর্শের প্রতি বাংলাদেশ প্রতিদিনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে সে প্রত্যাশাই করছি।
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী গানের জন্যেই আবদুল গাফফার চৌধুরী অমর হয়ে থাকবেন বাঙালির কাছে, সন্দেহ নেই।
বাংলাদেশ যখনই আক্রান্ত হয়েছে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের দ্বারা, যখনই বাংলাদেশের স্বাধীনতা, স্বাধীনতার চেতনা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে তখনই তিনি গর্জে উঠেছেন লেখনীর মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ যতবার ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেছে তিনি বিবেকের কলম চালিয়েছেন অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়ে?ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তের বিরুদ্ধে।
কিন্তু সারা জীবনের এই লেখালেখির জন্য?বঙ্গবন্ধুর অনুসারী ও বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে তাঁর আলাদা এবং বিশেষ স্বীকৃতি ও মর্যাদা পাবার কথা ছিল তা তিনি মৃত্যুর পরও পেলেন বলে মনে হলো না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এদের শোক প্রকাশ ও প্রতিক্রিয়ায় সেসবের উল্লেখ দেখা যায়নি।
গাফফার ভাইকে নিয়ে একটি বড় তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছিলো বাংলা টিভির প্রযোজনায়। সেই তথ্যচিত্রটি নির্দেশনা, স্ক্রিপ্ট সব আমার করা ছিলো, ক্যামেরায় ছিলো মিসবাহ মাহফুজুর।
গাফফার ভাই নিয়ে সর্বশেষ স্মৃতি হলো- গত বছর সেপ্টেম্বরে ৭ তারিখে নবাব ভাই, সাঈম ভাই, জুয়েল দা, বাবুল ভাইসহ আমরা বাসায় যাই। তিনি নবাব ভাই, সাঈম ভাই ও আমার লেখা ‘ব্রিটেনে বঙ্গবন্ধু’ বইটির মুখবন্ধ লিখে দিয়েছিলেন। একই দিনে মাসিক বিলেত পত্রিকার মোড়ক উন্মোচন করে দেন। এই উপলক্ষে দেয়া একটি ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, এই প্রকশনায় যুক্ত আছেন ‘বিশিষ্ট সাংবাদিক’ আ স ম মাসুম- এই স্বীকৃতি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। তিনি আমাকে নামে চিনতেন, এরচেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে আমার জন্য?
আমাদের একুশ শতকের বটতলা ছিলেন গাফফার ভাই, যে বটগাছ ছায়া দিয়েছে, ভালোবাসা দিয়েছে অগুনতি মানুষকে, আমিও তাদের একজন।
লণ্ডন, ২১ মে ২০২২
লেখক: সাংবাদিক, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন