Share |

নানা রঙের দিনগুলির একজীবনে আবদুল গাফফার চৌধুরী

সুজা মাহমুদ

জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা
শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,
দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবী
দিন বদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?
না, না, না, না খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।

আমার শহীদ ভায়ের আত্মা ডাকে
জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাটে
দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালবো ফেব্রুয়ারি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদ রফিকের নিথর দেহ দেখে, ক্ষোভ, বেদনা আর প্রতিবাদে আবদুল গাফফার চৌধুরী সেদিন বাংলার মানুষের হৃদয় নিংড়ানো সুর গেঁথে দিয়েছিলেন; আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলতে পারি।
এই একটি ব্যালাড লেখার পর তিনি যদি আর একটি শব্দও না লিখতেন, তাঁর অমরত্বের প্রয়োজন হতো কি? মনে হয় না। বাঙালীর কাছে একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে প্রভাতফেরির ‘সিগনেচার টিউন’ হয়ে রয়েছে ওই গানটি।
তারপরেও তিনি যেমন রাজনৈতিক ধারাভাষ্য আর সমকালীন বিষয় নিয়ে একের পর এক নিবন্ধ লিখে গিয়েছেন, তেমনই লিখেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, স্মৃতিকথা ও প্রবন্ধ। শুধুমাত্র একজন গীতিকার ছিলেন না, ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং সাহিত্যিক।
গাফফার চৌধুরী নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একজন সাংবাদিক হিসেবে, পঞ্চাশের দশকে। তিনি কাজ করতেন ‘দৈনিক ইনসাফ’ পত্রিকায়। তারপর ঠিক এক বছর পর তিনি ‘দৈনিক সংবাদ’- এ অনুবাদক হিসেবে যুক্ত হন । এছাড়াও তিনি বহু সংখ্যক পত্রিকায় কাজ করেছেন। এক সময়ে আর্থিক অনটনের শিকার হয়ে উপার্জনের পথ খুঁজতে হয়েছে তাঁকে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি সাংবাদিক হিসেবে ছিলেন। ১৯৫৮ সালে আবদুল গাফফার চৌধুরী দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার রাজনৈতিক পত্রিকা ‘চাবুক’-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। কিন্তু কিছুদিন পর সামরিক শাসন চালু হলে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত না থাকলেও ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে ’দৈনিক আওয়াজ’ বের করেন। একসময় ১৯৬৯ সালের পয়লা জানুয়ারি ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়া মারা গেলে তিনি আগস্ট মাসে হামিদুল হক চৌধুরীর অবজারভার গ্রুপের দৈনিক ‘পূর্বদেশ’-এ যোগ দেন। শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয়, কলকাতায় যুগান্তর এবং আনন্দবাজার পত্রিকায় কাজ করেছেন কলামিস্ট হিসেবে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সপরিবারে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন। তখনই কলকাতায় বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখির কাজে যুক্ত হন। সাংবাদিক স্বাধীনতা যুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের মাধ্যমে নিবন্ধিত স্বাধীন বাংলার প্রথম পত্রিকা সাপ্তাহিক জয় বাংলার প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। এছাড়াও পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে নিজের উদ্যোগে বের করেন দৈনিক জনপদ।
১৯৭৩ সালে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলজিয়ার্সে গিয়েছিলেন, সেখানে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। ফেরার পথে তাঁর স্ত্রী অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্ত্রীকেচিকিৎসার জন্য প্রথমে কলকাতায় নিয়ে যান, তারপর সেখান থেকে নিয়ে আসেন লণ্ডনে। তারপর থেকেই তিনি লণ্ডনে বসবাস করতে শুরু করেন। প্রথম দিকে আর্থিক কষ্টে তিনি বিভিন্ন গ্রোসারি দোকানে কাজ করেন। এরপর ১৯৭৬ সালে তিনি ’বাংলার ডাক’ নামে এক সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন। ’সাপ্তাহিক জাগরণ’ পত্রিকায়ও তিনি কিছুদিন কাজ করেছেন। ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি সাতজন অংশীদার নিয়ে ‘নতুন দিন’ পত্রিকা বের করেন। এরপর ১৯৯০ সালে ’নতুন দেশ’ এবং ১৯৯১ সালে ’পূর্বদেশ’ বের করেন। প্রবাসে বসে গাফফার চৌধুরী বাংলাদেশের প্রধান পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত লিখতেন। বাংলাদেশের শীর্ষ দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত আবদুল গাফফার চৌধুরীর রাজনীতি, সমসাময়িক ঘটনা ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী নিয়ে লেখা কলাম অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলো। তিনি সারা জীবনে বহুমুখী প্রতিভা এবং কাজের জন্য বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। একুশে পদক, বঙ্গবন্ধু পদক, শেরেবাংলা পদক, বাংলা একাডেমি পদক প্রভৃতি পদকে তাঁকে সম্মানিত করা হয়েছিল। এছাড়াও তিনি পেয়েছিলেন ইউনেস্কো পুরস্কার।
তাঁর নানান রঙের দিনগুলিতে বহমান জীবনে লেখনীর কলম কখনো থেমে থাকে নাই। ডানপিটে শওকত, চন্দ্রদ্বীপের উপখ্যান, নাম না জানা ভোরে, নীল যমুনা, শেষ রজনীর চাঁদ, পলাশী থেকে ধানমণ্ডি, বাস্তবতার নিরিখে- লেখা বইগুলি পঁয়ত্রিশটির মধ্যে উল্লেখিত প্রমাণ রেখেছে তাঁর লেখনী শক্তিকে।
আবদুল গাফফার চৌধুরী সমসাময়িক সময়ের শেষ সলতে নিভে গেলেন বৃহস্পতিবার (১৯ মে) আনুমানিক সকাল ৭টায় যুক্তরাজ্যের লণ্ডনে বার্নেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। ঠিক দুদিন আগে লণ্ডনে সন্ধ্যায় আকাশে পরিলক্ষিত হয়েছিল এক উজ্জ্বল ফায়ার বল নক্ষত্রসাদৃশ্য পাতের। আমাদের আকাশে কি তাই পূর্বাভাস ছিল আবদুল গাফফার চৌধুরীর প্রয়াণের। হয়তো!
লণ্ডন, ১৯ মে ২০২২
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।