Share |

জাতিবিদ্যাবিদ আবদুল গাফফার চৌধুরী : আমাদের আত্মার আত্মীয়

দিলু নাসের

আমি তখন খুব ছোট। বয়স ছয় কি সাত হবে, সবে মাত্র বর্ণমালা শিখেছি, স্কুলে যাওয়া হয়নি তখনো। মিছিল মিটিং, স্বাধীনতা, একুশে ফেব্রুয়ারী এসব কিছুর সাথেই পরিচিত হইনি তখনো, মনে পড়ে জীবনের সেই প্রথম ভোরে শিউলি ফোটা শৈশবে কোন এক সকালে বাড়ীর পাশের সুরু পথ দিয়ে প্লেকার্ড সহ সারি সারি মানুষের মিছিল যাচ্ছিলো, আর আমি জানলার গ্রীল ধরে তাকিয়েছিলাম মিছিলের পানে, সেই মিছিল থেকে ভেসে আসছিলো এক মোহনীয় সুর এবং কণ্ঠে কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছিলো-
‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রোয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি ....’
সেই মিছিল,সেই সুর, সেই গান আমাকে জীবনের প্রথম ঘর থেকে বের হওয়ার হাতছানি দেয়, আমারও ইচ্ছা হয় মিছিলের সেইসব মানুষের সাথে কণ্ঠ মেলাতে, তাই আমি জানলার গ্রীল টপকে চলি আসি রাস্তায়, কণ্ঠ মিলাই সেই মোহনীয় সুরে। তাই সেই গান আমার জীবন বিকাশের প্রথম পদধ্বনি।
তারপর বয়স বাড়তে থাকে, জীবন বইতে থাকলো আপন গতিতে, আমি ঘরের আঙিনা ছেড়ে স্কুলে গেলাম, পড়তে শিখলাম, জানতে শিখলাম। স্বাধীনতা আর একুশে ফেব্রুয়ারীর দিনে লাখো কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আমিও গাইলাম-
‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি....’
‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি ভুলিতে পারি ...’
তারপর ‘পথ বেঁধে দিলো বন্ধনহীন গ্রন্থি।’ মা-মাটি আর জন্মভূমির প্রতি আমারও জন্মালো ভালোবাসা। স্কুলের বইয়ের চেয়ে বাইরের জগত আমাকে টানতে লাগলো বেশী করে। অগ্রজ মিলু কাসেমের অনুপ্ররণায় সেই কৈশোরেই পড়া হলো দেশী বিদেশী অনেক বিখ্যাত লেখকের বই। কিন্ত যে গান, যে কবিতার পংক্তি আমাকে প্রথম ঘর থেকে বের হওয়ার আহবান জানিয়েছিলো, সেই গানের লেখকের শুধু নাম জানা হলো, কিন্তু পড়া হলো না তাঁর কোন রচনা।
দিন তারিখ মনে নেই, শুধু মনে আছে সেই স্মৃতিময় কৈশোরে একদিন হাতে এলো একটি বই, নাম ‘ভয়ংকরের হাতছানি” লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী। পড়ে ফেল্লাম রাত জেগে, এর পর একে একে পড়লাম তাঁর লেখা ‘ডানপিঠে শওকত’ ‘আঁধার কুঠির ছেলেটি’ সম্রাটের ছবি’ ‘সুন্দর হে সুন্দর’ ‘শেষ রজনীর চাঁদ’ ‘ইতিহাসের রাখালরাজা’ ইত্যাদি। এছাড়া পত্র-পত্রিকায় তাঁর অসংখ্য রচনার সাথে পরিচিত হলাম। পরিচিত হলাম তৃতীয় মতের সাথে।
বেড়ে গেলো এই অদেখা মানুষটির জন্য ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর আকর্ষণ। কোনো কাগজে তাঁর লেখা দেখলেই মনে হতো তিনি আমার পরিচিত আপনজন, আত্মার আত্মীয়, নিমেষেই পড়ে নিতাম সেসব রচনা।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে আবদুল গাফফার চৌধুরীকে যখন দেখার ইচ্ছা হলো তিনি তখন দেশছাড়া, আবাস গড়েছেন লণ্ডনে।
আশি’র দশকে একটি কাগজে তিনি নিয়মিত লিখতেন বিলেতের জীবন যাত্রা নিয়ে লেখা “জীবন থেকে নেয়া” সে সব লেখা পড়ে পরিচিত হলাম বিলেত প্রবাসি বাঙালীর জীবনযাত্রার সাথে।
জীবনের ঘুর্ণায়িত স্রোতের ধারায় ঘুরতে ঘুরতে একদিন আমিও চলে এলাম এখানে, সাত সাগর তের নদী পেরিয়ে বিলেতে, যে দেশে আবদুল গাফফার চৌধুরী থাকেন। এখানে আসার পর থেকেই প্রিয় মানুষটিকে দেখার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠলো। ১৯৮৬ সালে যুক্তরাজ্যে আসার পর প্রথম কয়েক মাস আমি বার্মিংহামে ছিলাম, বিভিন্ন ভাবে তাঁর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি, একদিন একটি বাংলা কাগজে দেখলাম লণ্ডনে একটি অনুষ্ঠান হচ্ছে, আর সেখানে উপস্থিত থাকবেন তিনি। দীর্ঘ দিনের আকাঙক্ষা আর উচ্চাশা নিয়ে নির্ধারিত দিনে চলে এলাম লণ্ডনে। সেই প্রথম বিশ্বের ব্যস্ততম নগরীর জনারণ্যে হারিয়ে যাওয়া, সেই প্রথম পাতাল রেল চড়ার রোমাঞ্চকর অনুভুতি, সেই প্রথম কৈশোরের ভালোলাগা একজন প্রিয়তম লেখককে স্বচক্ষে দেখা।
পূর্ব লণ্ডনের ডাকেট স্ট্রিটে তৎকালিন সিলেট সেন্টারে হচ্ছিলো আরেক প্রিয় মানুষ গণমানুষের কবি দিলওয়ারে সংবর্ধনা, কবি দিলওয়ার আমার পূর্ব পরিচিত, দেখেই জড়িয়ে ধরলেন, পাশে বসা ছিলেন একুশের অমর গানের লেখক প্রিয় গাফফার ভাই, মনে প্রাণে ভালোলাগার অনুভুতি বয়ে গেলো, মঞ্চের সামনে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর বক্তৃতা শুনলাম। অনুষ্ঠান শেষে সিলেট সেন্টারের বাইরে শেষ বিকেলের সোনাঝরা রোদ্দুরে কবি দিলওয়ার পরিচয় করিয়ে দিলেন কিংবদন্তীতূল্য গাফফার চৌধুরীর সাথে। আমি তাঁর দীর্ঘ ছায়ায় দাঁড়িয়ে হাতে হাত রাখলাম, নিমিষেই যেন ভুলে গেলাম গত কয়েক মাস ধরে বুকের ভেতরে জমে থাকা বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন আর স্বদেশ বিচ্ছেদের বেদনা। প্রথম সাক্ষাতেই তাঁর কথাবার্তা ব্যবহার আমাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করলো। গাফফার ভাই বললেন- “আপনার ছড়া জাগরণে পড়েছি, ভালো লেগেছে”। এতো বড় একজন গুণী লেখকের মুখে নিজের লেখার প্রশংসা শুনে আনন্দে চোখ ভিজে গেলো। এই চাকচিক্যময় দেশে হাজারো কাজের মাঝে নিজের সামান্যতম লেখক সত্তা বাঁচিয়ে রাখতে পারবো কি-না তা নিয়ে সন্দেহে ছিলাম। কিন্তু গাফফার ভাইয়ের সেদিনের সেই ছোট্ট কথা আমার থেমে যাওয়া চেতনাকে নতুন করে উজ্জীবিত করে।
সেই থেকে ব্যক্তি গাফফার চৌধুরীর সাথে পরিচয়, তাঁর সাথে প্রাণের বন্ধন, যা দীর্ঘ তিন যুগেও সামান্যতম ম্লান হয়নি, বরং দিনে দিনে কেবলই গাঢ় হয়েছে।
এর কয়েক মাস পরেই আমি স্থায়ীভাবে লণ্ডনে চলে আসি। গাফফার ভাইয়ের তত্বাবধানে তখন সবে মাত্র লণ্ডনের নতুন ধারার কাগজ সাপ্তাহিক “নতুনদিন” প্রকাশ পেয়েছে। লেখক সাংবাদিকদের পদচারণায় উইকাম হাউসের নতুনদিন অফিস মুখরিত থাকে, সেখানে আসতেন প্রখ্যাত লেখক গবেষক মরহুম আবদুল মতিন, তাসাদ্দুক আহমদ, শফিক রেহমান, বিবিসির সিরাজুর রহমান, তালেয়া রেহমান সহ আরো অনেকে। আমি কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে সেখানে যাই, তাদের সাথে যোগ দেই। কখনো নিভৃতে গাফফার ভাই এর মুখোমুখি বসি- কথা বলি। আস্তে আস্তে হৃদ্যতা বাড়ে।
বাংলাদেশ তখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে মুখর, লণ্ডনে এর ঢেউ এসে লাগলো, গাফফার ভাই সহ অন্যান্য লেখক সাংবাদিকদের কলম প্রতিবাদে সোচ্চার, আর আমি তাদের ক্ষুদে সহযোদ্ধা। গাফফার ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় সে সময় প্রতি সপ্তাহে আমি লিখতে থাকি প্রতিবাদী ছড়া, সবগুলো কাগজের প্রথম পাতায় বড় করে ছাপা হয় সে সব, কেউ আসলেই গাফফার ভাই কখনো নিজে পড়ে শোনান অথবা আমাকে পড়তে বলেন।
সে সময় গাফফার ভাই এর লেখা নাটক “এরশাদ মরিয়ম কেচ্ছা” মঞ্চস্থ হয়ে দেশে বিদেশে তোলপাড় তোলে।
তারপর গাফফার ভাই প্রকাশ করেন “নতুনদেশ” পত্রিকা এর পর সাপ্তাহিক “পূর্বদেশ” আমি তাঁর সম্পাদনা পরিষদের একজন হই।
কীর্তিমান পুরুষ আবদুল গাফফার চৌধুরীর সাহচার্যে জীবন হলো ধন্য। আমার মতো অখ্যাত মানুষ তাঁর কাছে থেকে শিখলাম অনেক কিছু। তাঁর স্নেহের ছোঁয়ায় বাড়তে থাকলো জীবনের পরিধি।
মনে পড়ে নব্বইয়ের প্রথম দিকে আর্থিক কারণে নতুন দেশ পত্রিকা বন্ধ, পূর্বদেশ বের করার প্রস্তুতি চলছে। বিভিন্ন কারণে গাফফার ভাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তবু প্রতিদিন এজওয়ার থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসে উইকাম হাউসের নিরিবিলি ছোট্ট কামরায় বিষণœ মনে বসে থাকতেন। আমি তখন ভরঘুরে, কাজকর্ম নেই। সারা দিন তাঁর ছায়ায় বসে থাকি আর একান্তে গল্প করি, তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের নানান কথা শুনে শুনে নিজের অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে জমা করি।
শুধু আমি নই, এই লণ্ডনের অনেকেই তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন, আমার মতো অনেক অখ্যাতকে তিনি বিখ্যাত বানিয়েছেন। হাতে কলমে লেখালেখি-সাংবাদিকতা শিক্ষা দিয়েছেন। এই ভিনদেশে বিদেশের মাটিতে বাংলা বর্ণমালাকে পাঠযোগ্য করার জন্য তাঁর যে অবদান তা অবিস্মরণীয়। তিনি তাঁর আর্থিক অবস্থাকে জলাঞ্জলি দিয়ে একের পর এক বাংলা কাগজ বের করে প্রবাসীদেরকে পত্রিকা পড়ায় আগ্রহী করেছেন।
ব্রিটেনে বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতি প্রসারে তাঁর ভূমিকা অনন্য। আমরা যে লণ্ডনকে এখন তৃতীয় বাংলা অথবা বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির তৃতীয় চারণভূমি বলি তা সম্ভব হয়েছে একমাত্র তাঁর জন্যই। তাঁর চেষ্টাতেই পূর্ব লণ্ডনের সাথে বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলার লেখক সাংবাদিকদের আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এখানে এসেছেন শামসুর রাহমান, সুনীল গাঙ্গুলী, শক্তি চট্টোপ্যাধায়, সুভাস মুখোপ্যাধায়সহ অনেক বরেন্য লেখক। আর তার সুবাদে অনেক কালজয়ী লেখকদের সাথে পরিচিত হয়েছি আমরা বেনামীরা।
তাঁর অনুপ্রেরণায় এখানে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠন,প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য মননশীল সাহিত্য সাময়িকী। জন্ম নিয়েছেন নতুন নতুন অনেক লেখক। শুধু তাই নয় এখানের অনেক বিত্তবানকে সাহিত্য সংস্কৃতির সেবায় এগিয়ে আসতে তিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন। উদীচি, বাংলা সাহিত্য পরিষদ, সংহতি,বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ সহ অসংখ্য সংগঠনের তিনি উপদেষ্টা।
২০১০ থেকে লণ্ডনে বাংলা একাডেমীর যে বইমেলা অনুষ্টিত হতো তার প্রধান কাণ্ডারী ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন আমাদের পথ এবং পাথেয়।
আশি’র দশকে আমরা যারা দেশ থেকে সামান্য লেখক সত্ত্বা নিয়ে এদেশে এসেছিলাম তারা হয়তো এসেই সোনালী পাউণ্ডের পিছনে হারিয়ে যেতাম আর আমাদের সত্ত্বারও অপমৃত্যু ঘটতো, কিন্ত আমাদেকে বাঁচিয়ে রাখতে গাফফার ভাইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। এখানের হীমেল হাওয়ায় আমার মতো অসংখ্য তরুণের থেমে যাওয়া চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন তিনি। বিলেতের সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক জগতের মানুষের কাছে তিনি আমৃত্যু ছিলেন বটবৃক্ষের মতো। ঝড়ঝঞ্জা, প্রবাস জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত আর হিমশীতল হাওয়ায় আমরা যখন হাঁফিয়ে উঠেছি, আমাদের কলম যখন থেমে যেতো তখন এই প্রাচীন বটবৃক্ষের সুশীতল ছায়ায় আমরা আশ্রয় নিয়েছি, এবং তাঁর স্নিগ্ধ-সতেজ সজীবতা আমাদেরকে পথ চলায় প্রেরণা যুগিয়েছে ।
যেখানে চার পাশে চাকচিক্যময় চোখ ধাঁধানো জীবন যাত্রা, আর রঙিন আলোর হাতছানি, সেখানে তিনি আমাদেরকে শুনিয়েছেন প্রত্যয়ের কালোত্তীর্ণ বাণী। মা-মাটি প্রিয় জন্মভূমির প্রতি আমাদের ভালোবাসা জাগ্রত করতে তাঁর কণ্ঠে দৃঢ় চিত্তে উচ্চারিত হয়েছে-

“মশাল কি নিভে গেলো বন্ধু
সুর্র্য্যরে রঙ মাখা রোদ্দুর
রক্ত কি মুছে গেলো বন্ধু
এই ঘোর অমানিশা কদ্দুর?
মশাল কি নিভে গেলো বন্ধু
রোদ্দুর মুছে যাবে সন্ধ্যায়
রক্ত কি মুছে যাবে বন্ধু
জীবনটা কেটে যাবে তন্দ্রায়?”

শুধু কবি সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী নয়, সাধারণ প্রবাসী বাঙালীর সাথেও ছিলো তাঁর হৃদয়ের সম্পর্ক। মানুষকে মুহূর্তে আপন করে নেয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিলো তাঁর। বাঙালীর প্রাণকেন্দ্র পূর্ব লণ্ডন থেকে অনেক দূরে এজওয়ারে তাঁর বাসস্থান, কিন্ত পূর্ব লণ্ডনের অলিগলি দিয়ে না হাঁটলে তাঁর ভালো লাগতো না। এখানে প্রতিটি উৎসবে, ছোট বড় সকল অনুষ্ঠানে কভিডের আগ পর্যন্ত তাঁর উপস্থিতি ছিলো সরব। প্রতিবাদে প্রতিরোধে প্রবাসীর সকল সুখে-দুঃখে আনন্দে বেদনায় তিনি সুদীর্ঘকাল থেকে সহযাত্রী।
খ্যাতির আকাশে এক উড়ন্ত ঈগল হওয়া সত্ত্বেও তিনি খেয়াল রাখতেন তাঁর পারিপার্শ্বের প্রতি। তাঁর শরীর যখন বয়সের ভারে নুজ্য, ডায়বেটিসে ভুগছেন অনেক বছর ধরে, দিনে কয়েকবার ইনসুলিন নিতে হতো, অসুস্থ পা’ নিয়ে হাঁটতে পারতেন না ঠিক মতো এর পরও মানুষের ডাকে ছুটে গিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। ছুটে আসতেন ইস্ট লণ্ডনে, গত কয়েক বছর আগেও কার্ডিফ, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টারসহ বিভিন্ন শহরে তিনি আমাদের সাথে ভ্রমণ করেছেন নির্দ্বিধায়।
আমাদের বইমেলা, কবিতা উৎসবে কনকনে ঠাণ্ডার মাঝেও সবার আগে গাফফার ভাই এসে হাজির হতেন এবং এসেই সার্বিক অনুষ্ঠানের তদারকী করতেন। শিশুর মতো সারল্য নিয়ে সবার সাথে আড্ডা দিতেন তিনি।
রাজনৈতিক কলাম লিখে তিনি খ্যাতি অর্জন করলেও গাফফার ভাই ছিলেন আপাদমস্তক একজন কবি। তার কবিতা এবং কথাসাহিত্য বাংলা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছে। একবার তাকে জিগ্যেস করেছিলাম চল্লিশ, পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে আপনি একজন সুসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু এখন হয়ে গেছেন খ্যাতিমান সাংবাদিক- কলামিস্ট। এর কারণ কি এবং এখন কেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আসলে সাংবাদিক হতে আমি চাইনি, চাইবার আগেই হয়ে গেছি। ছোটবেলা থেকেই গল্প-কবিতা দিয়ে লেখালেখি শুরু। কিন্তু আমাদের দেশে সাহিত্যের কোনো পেশাগত মূল্য ছিলোনা। বই ছাপার কেউ ছিলোনা। ছাপলে এক বছর ঘুরে ১শ’ টাকা দিতো, এটাই প্রথম এটাই শেষ। ইউনিভার্সিটি ছাড়বার আগে ভাবলাম এটাকে পেশা হিসেবে নেয়া যাবেনা। আমার সমসাময়িক সকলেই সাংবাদিকতা করতো। তখন থেকে সাংবাদিকতার কথা ভাবলাম। এখন সাংবাদিক হতে হতে এমন পর্যায়ে এসেছি যে একটা গল্প লিখলে পাই ৫শ’ টাকা, আর একটা রাজনৈতিক কলাম লিখলে আড়াই হাজার টাকা।
এখন কলাম লিখছি তবে আস্তে আস্তে আবার সাহিত্যে ফিরে আসার বাসনা আমার রয়েছে। আমার খুব ইচ্ছা মারা যাওয়ার আগে মুক্তিযুদ্ধের উপর একটি বড় উপন্যাস লিখি। এটা আমার একটা শখ। ছোট মুখে বড় কথা হবে- যেমন ‘ওয়ার এণ্ড পীস’ হয়েছিলো তলস্তয়ের। ওটা আমার কাছে একটা আদর্শ, আমি জানি আমি অতবড় প্রতিভাশালী লেখক নই তবুও চেষ্টা করবো। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস লিখতে চাই। আমি দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের উপর আংশিকভাবে লেখা হয়েছে কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কোনো একটা উপন্যাস লেখা হয়নি। যেখানে আমাদের জাতীয় সত্ত্বার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ঘটবে।
সাহিত্য রাজনীতি ছাড়াও ধর্মীয় বিষয়ে গাফফার ভাইয়ের ছিলো অগাধ জ্ঞান, হাদিস কোরান নিয়ে কথা বলতে পারতেন অনর্গল।
তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস ছিলো অটল। হজ করেছেন অনেক আগে। গত দুবছর ওমরা পালনে ও গিয়ে ছিলেন। আমার নিজের চোখে দেখা ঘর থেকে বেরুনোর সময় নিয়মিত দোয়া দুরুদ পড়ে বের হতেন। গত কয়েক সপ্তাহ আগে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম কথা প্রসঙ্গে বললেন, আমি তো নিজেকে একজন খাঁটি মুসলমানই মনে করি। ডাক্তাররা বলেছেন, আমি আর দশ এগারো মাস বাঁচবো কিন্তু তা বিশ্বাস করিনা। আমি মনে করি, আল্লাহ যেদিন চাইবেন সেদিনই আমার মৃত্যু হবে। তবে আমার মন বলছে, পাঁচ সাত মাসের বেশী বাঁচবো না।
গাফফার ভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছি বাংলা সাহিত্যের অনেক নামীদামি লেখক, সাংবাদিক এবং রাজনীতিবিদদের অজানা কাহিনী।
নাম আর সুনামের যার অন্ত ছিলোনা, সেই প্রবাদপুরুষ অনামীদের কাতারে নিজেকে বিলিয়ে দিতে একটুও কুণ্ঠাবোধ করেননি কখনও। তিনি সারাটা জীবন মানুষের মনে আলো ছড়িয়েছেন। মানুষকে ভালোবাসেন তিনি, আর মানুষের ভালোবাসাই তাঁর পরম সম্পদ। তিনি ভালোবাসতেন বাংলা-বাঙালী, তাই বাঙালীর ডাকে ছুটে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
তিনি পৃথিবীর যেখানেই যেতেন সেখানে বিলেতের সাহিত্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেতেন ।
লণ্ডনে থাকলে কি হবে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত তিনি ভাবতেন বাংলা এবং বাঙালী জাতিকে নিয়ে, তাই প্রয়াত বন্ধুবর কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু তাঁর নাম দিয়েছিলেন জাতিবিদ্যাবিদ। কয়েক মাস ধরে বিছানা থেকে উঠতে পারতেন না তবুও বাংলাদেশ বিলেতসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে নিয়মিত লিখে গেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন চলমান।
গত দুবছর কোভিডের কারণে তার সাথে দেখা না হলেও নিয়মিত কথা হয়েছে ফোনে। ডিসেম্বর জানুয়ারি ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেখা হয়েছে দুইবার। প্রাণ খুলে কথা হয়েছে ঘন্টা। ফেব্রুয়ারির ২৩ তারিখে শেষ সাক্ষাতে সাথে ছিলেন পত্রিকা সম্পাদক বন্ধুবর মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরী। আমরা তাঁর দীর্ঘ কথোপকথনের রেকর্ডিং করেছি।
কথা ছিলো রোজার পর একদিন সারা দিনের জন্য তার কাছে যাবো, তিনি বলেছিলেন অনেক কথা বলার আছে সময় নিয়ে এসো। আর যাওয়া হলোনা।
গত মাসে হঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলেন। এরই মধ্যে আত্মজা বীনুর অকাল প্রয়াণ হলো। তাঁর মৃত্যু বট বৃক্ষের মতো আবদুল গাফফার চৌধুরী কে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিলো। ফোন করলেই হাউমাউ করে কাঁদতেন। বলতেন, ভাইরে আমি কী পাপ করেছি যার জন্য আমার মেয়েটি অকালে চলে গেলো!
তাকে সান্তনা দেবার ভাষা আমার ছিলো না। শুধু বলেছি গাফফার ভাই আপনি তো আবদুল গাফফার চৌধুরী, জীবন এবং মৃত্যু সম্পর্কে আমাদের চেয়ে আপনি ভালো বুঝেন। তবে আল্লাহর কাছে তার জন্য দোয়া করেন। এটাই আপনার কাজ এখন।  কয়েক দিন আগে ডলি আপা (ডলি ইসলাম) ফোন করে বললেন, দিলু গাফফার তোমাকে একখানা কোরআন শরফি তাঁর কাছে পৌঁছে দিতে বলেছেন। আমি ফোন করলাম গাফফার ভাইকে। বললাম, আমাকে কী হাসপাতালে আসতে দেবে? বললেন, হয়তো না। আমি বললাম, গাফফার ভাই আপনি তাহলে সুরা ফাতেহা এবং সুরা এখলাস পাঠ করুন। বললেন, ঠিক আছে। আমি তখন তাকে সুরা ইয়াসিন এবং সুরা বাকারার অনুবাদসহ তিলাওয়াত পাঠিয়ে দিলাম। আর আয়াতুল কুরসি।
এর পর দুই দিন চলে গেলো আমি আর সময় পাইনি তাকে ফোন করার। গত সপ্তাহে কাজে ছিলাম, ফোন সাইলেন্স করা ছিলো। দুপুরে হাতে নিয়ে দেখি গাফফার ভাইয়ের দুটি মিস কল। সাথে সাথে ফোন করলাম। ফোন ধরেই আবেগে আপ্লুত হয়ে বললেন ভাইরে আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি বললাম, কেন গাফফার ভাই? প্রত্যুত্তরে বললেন, তুমি আমাকে সুরা ইয়াসিন পাঠিয়েছো তাই। আমি শুনছি আর প্রশান্তি পাচ্ছি। তাঁর কথায় আমার চোখও অশ্রু সিক্ত হলো। বললাম দেখতে আসবো ভাই।
আর তার সাথে কথা হয়নি। আর হবে না!!
প্রিয় গাফফার ভাই চলে গেছেন। আমাদেরকে দিয়ে গেছেন অনেক কিছু।
কিন্তু দুভার্গ্য আমরা এই প্রবাদতুল্য কীর্তিমান মানুষটিকে কখনো কিছুই দিতে পারিনি। তাঁর দুর্দিনে আমরা অনেকেই তার খবর রাখিনি। শেষের দিকে পরিচিত জনদের সাথে কথা বলতে তিনি ব্যাকুল ছিলেন, আমাকে বেশ কয়েকজনের কথা জিগ্যেস ও করেছিলেন, এবং ফোন করতে বলেছেন।
সারা জীবন অনেক সমালোচনায় বল্লমবিদ্ধ হয়েও গাফফার ভাই ছিলেন অবিচল। কারো প্রতি তাঁর কোন ক্ষোভ ছিলোনা অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা আর হিংসাকে সহযাত্রী করে তিনি পাড়ি দিয়েছেন বৃহত্তর জীবনের মহত্তর পথ।
জীবনের পথ বড়ই পিচ্ছিল এই পথে পথে কোন শিল্পীত মানুষের হেঁটে যাওয়া খুবই দুষ্কর, তাই তাঁকে বারবার হোঁচট খেতে হয়েছে। কিন্তু এরপরও তিনি অটল, দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠাবান। আমরা যারা তাকে যোগ্য সম্মান দেখাতে পারিনি এটা আমাদের জন্য লজ্জাকর, আমাদের ব্যর্থতা।
তিনি আর আসবেন না আমাদের হাসি আনন্দ, দুর্দিনে। তিনি এখন কেবলই স্মৃতি, কেবলই ছবি। জীবনদশায় আমরা যারা তাকে কিছুই দিতে পারিনি, যারা তাঁর স্নেহধন্য ছিলাম, যারা তাঁর সান্নিধ্যে এই বিদেশ-বিভূঁইয়ে ফিরে পেয়েছি জীবনের ঠিকানা, তাদের অন্তর থেকে আজ তাঁর জন্য দূর্লভ পুরস্কার, যার নাম ভালোবাসা। আর মহান আল্লাহর কাছে করজোড়ে প্রার্থনা এই শান্তিকামী মানুষটির কবরে যেন তিনি রহমত এবং অশেষ শান্তি বর্ষণ করেন। আমীন।
লণ্ডন, ২১ মে ২০২২
 লেখক: কবি, ছড়াকার ও সংস্কৃতিকর্মী।