Share |

গাফফার চৌধুরীর যে কষ্টগুলো আমাকে ছুঁয়ে যায়

বুলবুল হাসান

জীবনের শেষ বছরগুলোতে বেঁচে থাকাটা আবদুল গাফফার চৌধুরীর জন্য ক্রমশই ক্লান্তিকর ও আকর্ষণহীন হয়ে পড়ছিল। ৫৬ বছরের দাম্পত্য জীবন শেষে এক দশক আগে স্ত্রীর মৃত্যু ছিল তাঁর জন্য এক বড়ো ধাক্কা। এরপর দীর্ঘদিনের সুহৃদ সাংবাদিক আমিনুল হক বাদশার প্রস্থান। সবশেষ কন্যা বিনীতা চৌধুরীর অকস্মাৎ চলে যাওয়া তাঁকে দীর্ঘ সময় জ্বলে জ্বলে ক্ষয়ে যাওয়া মোমবাতির মতো নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। তিনি নিঃসঙ্গতা পছন্দ করতেন না। কিন্তু স্বজন এবং নিকটজনের এই অনুপস্থিত হয়ে যাওয়া তাঁকে নিঃসঙ্গ করে তুলছিল।
গাফফার চৌধুরীকে বিলেতের বাঙালী কমিউনিটির উদারপন্থী অংশ পুরোহিত মনে করতেন। তাঁর পৌরহিত্য ছাড়া সভা, সমাবেশ, সাংস্কৃতিক উৎসব রূপহীন তাৎপর্যহীন হয়ে উঠতো। বাঙালী সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াশীল অংশেরও তাঁকে ছাড়া চলতো না। গাফফার চৌধুরীকে নিয়ম করে গালি দিতে না পারলে অনেকেরই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হতো। তাঁর প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন কিংবা উদ্ধত আক্রমণকে ঐ মানুষগুলো তাদের ‘ঈমানী’ দায়িত্ব মনে করতো। এইসব অদ্ভুত বৈপরীত্যের ভেতর দিয়েও অসামান্য এক জীবন যাপন করে গেছেন তিনি। ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালীর যেমন সান্নিধ্য পেয়েছেন, তেমনি তাঁর আশপাশটা মৌমাছির মতো ঘিরে থাকতো ছদ্মবেশী ভক্ত অনুরাগীর দল। গাফফার চৌধুরীর মহত্ত্ব এখানেই যে, তিনি সীমাহীন ধৈর্য্য নিয়ে দিনের পর দিন এইসব অগণন ইতর শ্রেণীর মানুষকে সহ্য করেছেন।
প্রভাতফেরির গানটি তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। কিন্তু এই পরিচয়ে তিনি পরিচিত হতে চাননি। তিনি চেয়েছেন, তাঁর লেখাগুলো টিকে থাক। গাফফার চৌধুরী সাহিত্য রচনা করেছেন- উপন্যাস, গল্প এমনকি কবিতা। তাঁর ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’ এক অসামান্য উপন্যাস; গল্পগুলোও দারুণ গতিময়। তিনি হতে পারতেন বাংলা ভাষার মহত্তম কবিদের একজন। কবি হবার সকল প্রতিভা তাঁর ভেতরে ছিল; কিন্তু ‘মধ্যা?েই অস্তমিত’ হয়েছে সেই প্রতিভা। তিনি কিংবদন্তী ছিলেন, কেননা তাঁকে নিয়ে অনেক ধরনের জনশ্রুতি রয়েছে। মিথ্যা-উদ্দেশ্যমূলক-কল্পনাশ্রয়ী গল্প দিয়ে মানুষকে যারা হেয় করতে চাইতো, গাফফার চৌধুরী ছিলেন তাদের আরাধ্য লক্ষ্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মতাদর্শগত একটা নির্দিষ্ট চিন্তাবলয়ে আটকে থেকেছেন তিনি। হয়তো ইচ্ছে করেই। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক ভিত্তিকে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলমন্ত্র ভাবতেন। ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালী জাতীয়তাবাদকে তিনি সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন। এবং আমৃত্যু সেই বিশ্বাসে অবিচল থেকেছেন। অথচ সেই চেতনার ‘অশ্বারোহী’ যোদ্ধারা যে বিভ্রান্তির চোরাবালিতে আটকে গেছে, সেটি বুঝতে তাঁর অনেক সময় লেগেছে। যখন বুঝতে পেরেছেন, তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন, গ্লানি বোধ করেছেন এবং বেদনার্ত হয়েছেন। তাঁর সেই কষ্টের কথামালা সাগর নদী মহাসাগর পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির রংমহলে গিয়ে পৌঁছায়নি। কোনদিনই পৌঁছাবে না।
নারীমুক্তি ও সমতায় বিশ্বাস করতেন তিনি। ধারণ করতেন ফেমিনিজম বা নারীবাদের আধুনিক চিন্তা-চেতনাকে। পরীমনি-তসলিমাদের গুণমুগ্ধ বা রূপমুগ্ধ ছিলেন না তিনি। কিন্তু লেখার স্বাধীনতা কিংবা মানুষ হিসেবে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার থেকেছেন। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন; কাজেই আক্রান্ত হবেন জেনেও তিনি বিপন্ন অনেকের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন, অথচ নাস্তিকতার ‘অপরাধে’ তাঁকে আক্রান্ত হতে হয়েছে। গাফফার চৌধুরীর বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চতাকে ভয় পেত বামনরা, তাই তাঁকে একবার ইস্ট লণ্ডনে অবাঞ্ছিতও ঘোষণা করেছিল কমিউনিটির নেংটি ইঁদুরগুলো।
গাফফার চৌধুরীর মৃত্যু পর তাঁর সাথে অন্তরঙ্গ ছবিতে ছেয়ে গেছে ফেইসবুক। তাঁর প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশের জের ধরে প্রকাশ্যে গালিগালাজ করেছেন এমন একজনকে দেখলাম গাফফার চৌধুরীর সাথে ঘনিষ্ঠতা প্রমাণে খনি শ্রমিকের মতো পরিশ্রম করে যাচ্ছেন!
প্রিয় গাফফার ভাই,
আপনি না হয় চলে গিয়ে বেঁচে গেলেন, কিন্তু আমরা এই শ্বাপদের হিংস্রতা আর মূর্খের আস্ফালন থেকে কিভাবে বাঁচবো সেই মন্ত্রটা শিখিয়ে গেলেন না!
লণ্ডন, ২২শে মে ২০২২
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক