Share |

‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু’

নজরুল ইসলাম বাসন

১৯ শে মে ২০২২ বৃহস্পতিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে ওয়াটস’পে দু:সংবাদটি দেখলাম, গাফফার ভাই ইন্তেকাল করেছেন। পরে আরেকটি ট্যাক্সট পেলাম সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এমদাদুল হক চৌধুরির কাছ থেকে। লিখেছেন বাসন ভাই গাফফার ভাইর উপর সাপ্তাহিক পত্রিকা ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে একটি লেখা দিতে পারবেন কি? উত্তর দিলাম পারবো। ১৯৭৪ সালে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে গাফফার ভাই লণ্ডন চলে এসেছিলেন, আর দেশে ফিরে যাননি। আসার সময় তিনি একটি কলাম লিখে এসেছিলেন ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু: সে এক মান অভিমানের ইতিহাস। যে লিখেছেন ও যার কাছে লিখেছেন শুধু তারাই জানেন এর মর্মার্থ। গাফফার ভাইর অনেক লেখায় প্রয়াত লেখক ও সাংবাদিক সর্বজনাব এম আর আখতার মুকুল, ফয়েজ আহমদ এর সাথে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠতার কথা উঠে এসেছে।
লণ্ডনে আমার প্রথম গাফফার ভাইর সাথে দেখা ব্রাডি সেন্টারের বাইরে। সালটা ১৯৮৫, মাস মনে নেই জুন-জুলাই হতে পারে। সিলেট অঞ্চল থেকে আসা প্রাক্তন ছাত্রদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা অতিথি হিসাবে এনেছিলেন ‘লিগেসি অব ব্লাডের’ লেখক গোয়ানিজ সাংবাদিক এন্থনি ম্যাসকারনেসকে। এন্থনি ম্যাসকারনেস ইতোমধ্যে ব্রিটিশ টেলিভিশনের জন্য বঙ্গবন্ধুর খুনী কর্নেল ফারুক ও কর্নেল রশীদের ইন্টারভিউ নিয়েছেন। গাফফার ভাই এন্থনি ম্যাসকারনেসের সাথে বসবেন না, তাই হল ছেড়ে বের হয়ে এসেছেন, তার পিছু পিছু বের হয়ে এসেছেন তাসাদ্দুক আহমদ সাহেবও। দুই মহারথির সাথে আমার দেখা এভাবেই। তারা কতক্ষণ কথাবার্তা বল্লেন, আমি দুজনের সাথেই ঐদিন পরিচিত হলাম।
আবদুল গাফফার চৌধুরী- এই নামের সাথে কোনো বিশেষণ প্রয়োজন হয় না। আপনি তাকে পছন্দ করেন বা না করেন এতে কিছু এসে যায় না, কিন্তু তাকে আঅগ্রাহ্য করতে পারবেন না। এই ছিলেন লেখক, গীতিকার, সাংবাদিক সদ্যপ্রয়াত আব্দুল গাফফার চৌধুরী। আমাদের কিশোর বেলায় ও তারুণ্যে সংবাদের দরবার ই জহুর-এর জহুর হোসেন চৌধুরী, ইত্তেফাকের মঞ্চে নেপথ্যের স্পষ্টভাষী খোন্দকার আব্দুল হামিদ, দৈনিক বাংলার নির্মল সেন, ফয়েজ আহমদ, আহমদ নুরে আলমের মত প্রথিতযশা লেখকদের কলাম পড়েছি। তবে এ কথা স্বীকার করতেই হয় জনাব আব্দুল গাফফার চৌধুরির কলামে ছিল যাদুপড়া, ধরলে আর শেষ না করে উঠা যেতনা।
লণ্ডনে আসার পর আমি জনমত, জাগরণ, দেশবার্তা ও সুরমায় লেখতাম, বেশীরভাগ লেখাই সমসাময়িক বিষয়ের উপর। এ সময় আমি জনমতে ‘আমার দেখা সিলেটের রাজনীতির দেড় যুগ’ নামে ধারাবাহিক একটি লেখা লিখি। বন্ধু সৈয়দ সামাদুল হক বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ধারাবাহিকটি ছাপিয়েছিলেন। জনমতে এই লেখা ছাপা হবার কয়েকমাস পরে আমি সাপ্তাহিক সুরমায় বার্তা সম্পাদক পদে যোগ দেই। গাফফার ভাই তখন সাপ্তাহিক জাগরণ চালাতেন। তিনি তার কলাম তৃতীয়মত ও জীবন থেকে নেয়া লিখতেন। ডা: মুর্শেদ তালুকদার (মরহুম) জাগরণের সম্পাদক ও স্বত্বাধিকারি তবে পত্রিকা চালাতেন গাফফার ভাই। স্বৈরাচারী জেনারেল এরশাদের আমল। ইস্ট লণ্ডনে তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বামপন্থী ৫ দলের জোটের তীব্র আন্দোলন। ব্রিকলেইনের আলাদিন রেস্টুরেন্ট ছিল বাংলাদেশ থেকে আসা ছাত্র ও কমিউনিটি নেতা ও রাজনীতিকদের আড্ডার কেন্দ্র। মন্টিফিউরি সেন্টার, ব্রাডি সেন্টার, টয়েনবি হলে প্রত্যেক শনি ও রবিবার একটা না একটা অনুষ্ঠান লেগেই থাকতো। গাফফার ভাই এসব অনুষ্ঠানে আসতেন।
১৯৮৭ সালের দিকে (অধুনালুপ্ত নতুন দিনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা) মরহুম তারা মিয়ার এক আত“ীয়কে চাকুরি দেয়ার নাম করে জাতীয় পার্টির সমন্বয়কারি মাহবুবুল আলম আর্থিক লেনদেন করেন। মাহবুবুল আলমের মিসেস ছিলেন হাই কমিশনে এডুকেশন এটাচি। মরহুম তারা মিয়ার আত“ীয় ঐ ব্যক্তির চাকুরি হাইকমিশনে হয়নি, এই রকম একটা ঘটনার খবর ছাপানোর জন্যে মরহুম তারা মিয়া লণ্ডনের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় গেলে ঐ পত্রিকার সম্পাদক তাদের সংবাদটি ছাপাবেন না বলে তাদের ফিরিয়ে দেন। মরহুম তারা মিয়া ও তাঁর শুভাকাংখীরা গাফফার ভাইর কাছে গেলে, গাফফার ভাই তাদের পক্ষে কলম ধরবেন বলে কথা দেন। পরবর্তীকালে দেখা যায় মরহুম তারা মিয়া ও তাঁর শুভাকাংখীদের একটি গ্রুপ গাফফার ভাইকে সম্পাদক ও অংশীদার করে সাপ্তাহিক নতুন দিন নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই সময়ে জেনারেল এরশাদের সাথে লণ্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মীর শওকত আলী বীরউত্তমের সম্পর্কচ্ছেদ ঘটে, নিরাশ্রয় মীর শওকত আলীকে পরিবারসহ থাকার জায়গা দিলেন জনাব মহিব চৌধুরী। জেনারেল শওকত পরে এজওয়ারে বাড়ী নিয়ে চলে যান।
নতুন দিন প্রকাশে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন জনাব মহিব চেীধুরী। নতুন দিন পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল সুন্দর পরিচ্ছন্ন গেটআপ মেকআপ নিয়ে। নতুন নতুন কলামের মধ্যে মরহুম তাসাদ্দুক আহমদ লিখতেন জীবন খাতার কুড়ানো পাতা, প্রয়াত জেনারেল আব্দুর রহমানের স্ত্রী নাজমা রহমান চিঠিপত্রের উত্তর দিতেন মনের কথা নামের পাতায়। গাফফার ভাইর নিজের কলামতো ছিলই। অল্প কিছুদিনের মধ্যে জনমত, সুরমা আর দেশবার্তার পাশাপাশি নতুন দিন ভালভাবে জায়গা করে নিল। গাফফার ভাইয়ের পত্রিকা-ভাগ্য খুব প্রসন্ন ছিল না। তিনি নতুন দিন ছেড়ে দেবার পর নতুন দেশ ও পূর্বদেশ নামে আরো দুটো সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। সেসবও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল লণ্ডনে একটি পত্রিকা টিকিয়ে রাখা যে কি কস্টকর তা যারা পত্রিকার সাথে জড়িত আছেন তারা জানেন। বিশেষ করে পত্রিকা চালানো একটি ব্যয়বহুল ব্যাপার। আর্থিক সংস্থান করা গাফফার ভাইর জন্যে দুষ্কর হয়ে পড়ে। এক সময় গাফফার ভাই বেল তলায় যাওয়া ছেড়ে দেন। তিনি জনকণ্ঠ ও পরে প্রথম আলোতে কলাম লিখতেন এবং তার উপার্জনও ছিল খারাপ ছিল না।
গাফফার ভাইর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে ছিলেন মরহুম আমিনুল হক বাদশা ভাই, ছড়াকার দিলু নাসের, সংগীত শিল্পী হিমাংশু গোস্বামি। অনুজপ্রতীম দিলুর কাছ থেকে গাফফার ভাইর অনেক কথা শুনতাম। দিলু জানালো এই সেদিনও সে গাফফার ভাইকে সুরা পাঠিয়েছে। গাফফার ভাই আবেগ আপ্লুত হয়ে তা শুনেছেন বলে দিলুকে জানিয়েছেন।
৮৮ বছর বয়সে জনাব আব্দুল গাফফার চৌধুরী ইহলোক ত্যাগ করেছেন তার বয়সী কেউ এখন আর বেচে নেই, গাফফার ভাই সম্পর্কে তার এক শুভাকাংখী বললেন গাফফার ভাইর আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল না ঠিকই কিন্তু তিনি মাথা বিক্রি করেননি। তিনি যখন যা নিয়ে লিখবেন ঠিক করেছেন তা নিয়েই লিখেছেন। গাফফার ভাইর দৃষ্টি থেকে যখন চিত্রনায়িকা পরীমনির দুঃখও বাদ গেল না, পরিমনীর দুঃসময়ে যখন গাফফার ভাই কলম ধরলেন তখন পরীমনির মুক্তির পথ একটু সহজ হয়ে এল। এ ধরনের অনেক উদাহরণ আছে যখন ভয়ে কেউ লিখছেন না, গাফফার ভাই সাহস করে লিখেছেন। তিনি তাঁর লেখার জন্যে নিন্দিত ও নন্দিত হয়েছেন এ রকম একটি লেখা তিনি লিখেন ১৯৮৫ সালের দিকে জেনারেল এরশাদ লণ্ডনে এলে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়ে। তার কলামের হেডিং ছিল আমার হাতে রক্তের দাগ নেই। এই লেখাটি নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছিল। বছর কয়েক পরে এরশাদের লণ্ডন সফরকালে গাফফার ভাইয়ের লিখিত বাহার উদ্দিন খেলন পরিচালিত এরশাদ মরিয়ম কেচ্ছা নাটক মঞ্চস্থ হল। গাফফার ভাই তখন প্রশংসিত হলেন। তবে নাটক যাতে মঞ্চস্থ না হয় সেজন্যে পরিচালক বাহার উদ্দিন খেলনের উপর আক্রমণ হয়, তিনি ব্রিকলেনে আক্রান্ত হলেন। নাটকের অভিনেতা অভিনেত্রীদের নিরাপদ জায়গায় রাখা হল। এই নাটকের অভিনেত্রী শাহিন জামান এখন অসুস্থ।
আমার এই লেখাটি শেষ করার আগে একটু অনুরোধ করতে চাই- গাফফার ভাই চলে গেছেন, তিনি তার ‘লিগ্যাসি’ রেখে গেছেন। সেটি বাঁচিয়ে রাখার জন্যে দেশে তার স্মরণে একটি ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে নতুন প্রজন্মের মিডিয়া কর্মীদের জন্যে থাকবে রিসোর্স ও ট্রেনিং সেন্টার। গাফফার ভাইর আত“া শান্তিতে থাকুন। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রইল সমবেদনা।
লণ্ডন, ২০শে মে ২০২২
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, সাপ্তাহিক সুরমার সাবেক সম্পাদক।