Share |

একটি কলম থেমে যাওয়ার শোক

হামিদ মোহাম্মদ

আবদুল গাফফার চৌধুরী মর্ত্যলোক ছেড়ে চলে গেছেন অমর্ত্যলোকে। শায়িত হবেন প্রিয়তমা স্ত্রীর পাশে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। লন্ডনে তিনি ছিলেন দেশছুট বাঙালীর বাতিঘর। প্রবাসী বাঙালী মাত্রই রাতদিন দেশকে নিয়ে ভাবেন, দেশের সুখবরে আপ্লুত হন, খারাপ খবরে ব্যথিত হন। আবদুল গাফফার চৌধুরীও ব্যতিক্রম নন। তবে তিনি বসে থাকতেন না, তিনি যে কোন ক্রান্তিকালে শিরদাঁড়া নিয়ে সংকটে বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধা হয়ে জাতির পাশে দাাঁড়াতেন। এই ছিল তাঁর বিশেষত্ব। তিনি সুখের বন্ধু শুধু নন, তিনি সংকটের বন্ধু। এই জন্য তিনি আমাদের বাতিঘর। কলম ছিল তাঁর অমোঘ ও অব্যর্থ অস্ত্র। আজ থেকে আমাদের এই যোদ্ধা কলম থেমে গেছে। তাই এই থেমে যাওয়া কলমের জন্য আমরা শোকাচ্ছন্ন।
আবদুল গাফফার চৌধুরীকে নিয়ে শত শত মানুষের শত শত স্মৃতি আছে। সকলেই প্রবল শ্রদ্ধাভরে এসব স্মৃতি স্যোসাল মিডিয়ায় ব্যক্ত করে যাচ্ছেন। এসব পড়ে কাতর ও বাকরুদ্ধ হতে দেখেছি যার সাথে কথা বলেছি তাকেই।
৭/৮ মাস আগে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম তাঁর পশ্চিম লন্ডনের এজোয়ার রোডের বাসায়। সাথী ছিল গাফফার চৌধুরীর স্নেহসিক্ত তরুণ লেখক ফেরদৌস কবির টিপু। টিপু পথে যেতে যেতে বললো, গাফফার চৌধুরীর সাথে কোন আলাপে আপনার কথা উঠলে বলতেন, ‘হামিদ মোহাম্মদ মানে হামিদ ভাইর কথা বলছো নাকি? আমি বলতাম জ্বি।’ টিপু বললো, গাফফার চাচা আপনাকে খুব ভালবাসতেন। ‘ভাই’ বলে সম্মোধন করতেন। আবদুল গাফফার চৌধুরীর চেয়ে বয়সে আমি অনেক ছোট হলেও তিনি আমাকে যে মর্যাদা দিতেন সে কথাই টিপুর কথা থেকে উঠে আসে। সেদিন আমাকে দেখে তিনি বলেছিলেন, আপনি অসুস্থ, এর মাঝে আমাকে দেখতে এসেছেন কেন? আমি বলেছিলাম, মনের টানে এসেছি। প্রায় দু’ঘন্টা ছিলাম তাঁর সাথে। আমি তেমন কথা বলিনি, তাঁর কথা শুনতে গিয়েছিলোম। তিনি বললেন, সমাজকে তো অনেক কিছু দিলেন, পেলেন কি? এই কথায় আমি অপ্রস্তুত হয়ে যাই। মৃদু হেসে বললাম, না আমি কীই-বা দিলাম, আমি অনেক ছোট মানুষ, এসব নিয়ে কোন দিন ভাবিনি।
স্পষ্টভাষী আবদুল গাফফার চৌধুরী তাঁর অসাম্প্রদায়িক বিশ্বাস ও চেতনা এবং স্পষ্টভাষ্যের জন্য সবাইকে আলোড়িত করেছেন, আলোচিতও হয়েছেন। সমালোচনাও তাঁর পিছু ছাড়েনি।
সম্প্রতি তিনি তাঁর জীবনের অন্যতম সঙ্গী পরম স্বজন আমিনুল হক বাদশা, বাদশাহভাইকে নিয়ে ‘বাদশাহনামা’ স্মৃতিকথা লিখছিলেন। শেষের দিকে তিনি হাতে আর লিখতে পারতেন না, অনুলিখন করতেন তাঁর স্নেহভাজন ফেরদৌস কবির টিপু। কয়েক দফা এই স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয়েছে। বাকী অংশটুকু হাসপাতাল ছাড়ার পর লিখবেন বলে কথা দিয়েছিলেন, কিন্তু নিয়তি সে কথা রাখার সুযোগ দেয়নি।
আমার সৌভাগ্য হয়েছিল, তাঁর অনেক লেখা সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশের জন্য টাইপ করার। আমি অভিভূত হয়েছি-এতো স্পষ্ট হাতের লেখা এবং অবাক হয়েছি একটানে লেখার তাঁর ক্ষমতা দেখে। কোন কাটাকুটি তিনি করতেন না।
ভোজন রসিকও তিনি ছিলেন। ভাল খাবার খেতে আনন্দ পেতেন। এই সেদিন তিনি পত্রিকা সম্পাদক মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরীর সাথে হাসপাতাল থেকে ফোনালাপে একদিন তাকে ‘ইফতারী’ খাওয়ানোর অনুরোধ করেছিলেন। এমদাদুল হক চৌধুরী চাইলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নানা নিয়মকানুনের বেড়া ডিঙ্গিয়ে তা আর হয়ে ওঠেনি। কেননা, তিনি কোভিডে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা, ‘বাদশাহনামা’ লেখা শেষ করা ও ‘ইফতারী’ খাওয়া শখ পূরণ হয়নি। এমদাদুল হক চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী তিনি খুব আবেগতাড়িত হয়ে কথা বলছিলেন সেদিন। তবে সীমাহীন আশাবাদিতাও তাঁর কথায় ছিল।
শেষ কথা, আবদুল গাফফার চৌধুরীকে নিয়ে লেখার কি শেষ আছে? অনেক স্মৃতির ভীড়ে মনে হল- আজ থেকে শুরু তাঁর বেঁচে থাকার দিন। মৃত আবদুল গাফফার চৌধুরী বাঁচবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। এই ভাগ্য তিনি নিজে রচনা করে গেছেন। ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ এই সহজ ও মর্মভেদী গানের জন্য, শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের সব মানুষের অন্তরে বেঁচে থাকবেন। তাঁর এ গানের প্রভাবেই ভাষা-সংগ্রামের এদিনের নামই হয়ে যায় ‘একুশে’। আজ অগণিত প্রশ্নের মাঝে একটি প্রশ্নই উঁকি দিচ্ছে বার বার- অসংখ্য কালজয়ী লেখার ‘কলম থেমে যাওয়ার শোক’ বহন করার ক্ষমতা কি আছে আমাদের?
লণ্ডন, ২১ মে ২০২২
লেখক: কবি ও সাংবাদিক