Share |

কিয়েভ দখলের আশা ছাড়েননি পুতিন

পত্রিকা ডেস্ক
লণ্ডন, ৩০ মে: ইউক্রেনে রুশ হামলার তিন মাস পেরিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে রাশিয়ার স্থলবাহিনী ইউক্রেনজুড়ে অনেক শহরে হামলা চালিয়েছে। হামলা হয়েছে আকাশপথেও। অন্যদিকে ইউক্রেনের সেনারা অনেক জায়গায় পশ্চিমা সহায়তার অর্থ-অস্ত্রে রুশ বাহিনীকে রুখে দিয়েছেন। তিন মাস পর এসে রাশিয়া তার মনোযোগ ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলে সীমাবদ্ধ করেছে। এই অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চায় মস্কো। বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, চলমান যুদ্ধ পূর্বাঞ্চলের দনবাস ঘিরে চললেও ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও উত্তরাঞ্চলের খারকিভ দখলের আশা এখনো ছাড়েননি রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন।
সামরিক বিশ্লেষক মিখায়েল কোফম্যান গত সপ্তাহে এক টুইট বার্তায় বলেন, যুদ্ধের এখনকার পরিস্থিতি ইউক্রেনের অনুকূলে রয়েছে। রুশ বাহিনীকে রুখে দিতে দেশটির যথেষ্ট সেনা রয়েছে। এমনকি পশ্চিমা সামরিক সহায়তা পাওয়ার পথও উন্মুক্ত রয়েছে।
কিন্তু দনবাসের পরিস্থিতি ঠিক উ?ো। এই অঞ্চলে পুতিনের লক্ষ্য কত দ্রুত অর্জিত হচ্ছে, সেটার ওপর ইউক্রেনের অন্যান্য অংশে রুশ বাহিনীর অবস্থান অনেকাংশে নির্ভর করবে। এর ভিত্তিতে চলমান যুদ্ধে মস্কোর লাভ-ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা হবে।
২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর থেকে দনবাস অঞ্চলে রুশপন্থীদের প্রভাব ক্রমেই বেড়েছে। তাই এখন দনবাসে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চান পুতিন। গত সপ্তাহ থেকে পূর্বাঞ্চলীয় শহর সেভেরোদোনেৎস্কে সর্বাত্মক হামলা চালিয়ে আসছে রুশ বাহিনী। সেখানে ১০ হাজার সেনা ও ২ হাজার ৫০০ সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে মস্কো। চলছে গোলাবর্ষণ। শহরটির পতন ঠেকাতে তীব্র লড়াই করছেন ইউক্রেনের সেনারাও।
বিশ্লেষকদের মতে, সেভেরোদোনেৎস্ক রাশিয়ার দখলে গেলে পুরো লুহানস্ক অঞ্চলে রুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে রুশ বাহিনীর দোনেৎস্ক নিয়ন্ত্রণের পথ সুগম হবে। মিখায়েল কোফম্যান বলেন, ‘আমি মনে করি না যে রাশিয়ার আক্রমণের গতি মন্থর হয়ে এসেছে। তবে কখন চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবে, সেটা অনুমান করা কঠিন।’
রাশিয়া আপাতত পুরো ইউক্রেন দখল না করলেও দেশটিকে খণ্ড-বিখণ্ড করতে চায়, এটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। ক্রিমিয়া দখলের মধ্য দিয়ে আট বছর আগেই এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে মস্কো। এর পরিপ্রেক্ষিতে দনবাস অঞ্চলের দোনেৎস্ক ও লুহানস্কের মস্কোপন্থীদের সমর্থন জুগিয়েছেন পুতিন। এমনকি যুদ্ধ শুরুর পরপর খেরসন ও জাপোরিজিয়ায় দ্রুত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে মস্কো।
যুদ্ধ শুরুর পর দ্রুতই রাজধানী কিয়েভের উপকণ্ঠে পৌঁছে গিয়েছিল রুশ বাহিনী। তবে পরে পিছু হটে তারা। যুদ্ধ শুরুর পর কয়েক সপ্তাহ ধরে কিয়েভের পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। হঠাৎ বিমান হামলার সতর্কতা সাইরেন বেজে ওঠা এবং প্রধান সড়কে সশস্ত্র ব্যক্তিদের চলাফেরা ছাড়া যুদ্ধের আর কোনো চি? নেই। রেস্তোরাঁ ও অপেরা খুলেছে। তবে রাত ১১টার পর থেকে কারফিউ বহাল আছে। রুশভাষী সংবাদমাধ্যম মেদুজা গত সপ্তাহে ক্রেমলিন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, দনবাসে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অপেক্ষায় আছেন পুতিন। এরপর কিয়েভে আবারও হামলা চালাতে পারে রুশ বাহিনী।
কিয়েভের মতো ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভেও শুরুর দিকে প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল রুশ বাহিনী। এর ফলে শহরের উপকণ্ঠে অবস্থান নেয় তারা। গত কয়েক সপ্তাহে রুশ সেনারা আরও পিছু হটেছেন। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রথমবারের মতো খারকিভে দুই পক্ষের গোলা বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন দেশটির ৯ জন বেসামরিক নাগরিক।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, খারকিভে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া রুশ বাহিনী। পিছু হটে আসার পরিকল্পনা তাদের নেই। এই বিষয়ে ইউক্রেনের একজন সেনা কমাণ্ডার গত সপ্তাহে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘তারা (রুশ বাহিনী) কিছু একটা পরিকল্পনা করছে। আমরা তখনই সেটা সম্পর্কে জানতে পারব, যখন তা ঘটবে।’
এদিকে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মারিউপোল এখন দৃশ্যত রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। শহরটিতে রুশ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন ইউক্রেনের অনেক সেনা। তাঁদের ছেড়ে দিতে সাম্প্রতিক ফোনালাপে পুতিনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ।
বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, দনবাসসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চল দখলে নিতে পারলে সেসব জায়গায় দ্রুত নিজস্ব সময় ব্যবস্থা (টাইম জোন), রুশ পাঠ্যক্রম চালু করবে মস্কো। এর ফলে সেসব অঞ্চলে রাশিয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। সে সঙ্গে কমে আসতে পারে সংঘাত। দুই পক্ষের শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে কিংবা চূড়ান্ত চুক্তিতে এসব অঞ্চলের ভূমিকা থাকতে পারে।
তবে নিজেদের অঞ্চলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালেও ইউক্রেন বসে থাকবে না। আর হামলা হলে রাশিয়াও পা?া জবাব দেবে। তখন মস্কো বলবে, রুশ নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে কিয়েভ। এর ফলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার দীর্ঘ মেয়াদে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।