Share |

জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবেলায় সরকারের উদ্যোগ : ১৫ বিলিয়ন পাউণ্ড সহায়তা ঘোষণা

পত্রিকা প্রতিবেদন
লণ্ডন, ৩০ মে: জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবেলায় বড় ধরণের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের প্রতিটি পরিবার গ্যাস-বিদ্যুত বিলে এককালীন ৪০০ পাউণ্ড ছাড় পাবে। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলো পাবে এককালীন ৬৫০ পাউণ্ড। এছাড়া যেসব পরিবারে পেনশনার রয়েছেন ওইসব পরিবার বাড়তি আরো ৩০০ পাউণ্ড পাবে। আর প্রতিবন্ধী ভাতা পেয়ে এমন ব্যক্তিরা এককালীন ১৫০ পাউণ্ডের বাড়তি সহায়তা পাবেন।
গত ২৭ মে শুক্রবার চ্যান্সেলার ঋষি সুনাক সরকারী এই সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। জ্বালানীসহ নিত্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে ব্রিটেনের সাধারণ মানুষ বেশ কষ্টে আছে। অনেকে বাধ্য হয়ে কম খেয়ে জীবনযাবন করছেন বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোসহ বিভিন্ন মানবাধিকার ও দাতব্য সংগঠনগুলো এ অবস্থায় সরকারী সহায়তার আহবান জানিয়ে আসছে। বিরোধী দল লেবার পার্টি দামি বৃদ্ধির ফলে জ্বালানী কোম্পানিগুলোর বাড়তি লাভের ওপর ট্যাক্স আরোপ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তার আহবান জানায়। অবশেষে সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তায় বড় অংকের অর্থ সহায়তার ঘোষণা দিলো। আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এসব সহায়তা পাবে জনগণ।
জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবেলায় সরকারী এই সহায়তার জন্য মোট খরচ হবে ১৫ বিলিয়ন পাউণ্ড। এরমধ্যে জ্বালানি কোম্পানিগুলোর লাভের ওপর ২৫ শতাংশ সাময়িক ‘লেভি’ আরোপ করে পাওয়া যাবে ৫ বিলিয়ন পাউণ্ড। আর বাকী ১০ বিলিয়ন পাউণ্ড সরকার ঋণ নেবে।
চ্যান্সেলার ঋষি সুনাক বলেছেন, যুক্তরাজ্যের সকল মানুষের জন্য তিনি যতটা সম্ভব উদার সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বাড়তি সহায়তা নিশ্চিত করেছেন।
আগামী অক্টোবর মাসে বিদ্যুত বিল ঘরপতি ৮০০ পাউণ্ড পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় ঘোষিত সহায়তা জনগণকে কিছুটা স্বস্তি দেবে বলে মনে করেন তিনি।
ইনস্টিটিউট ফর ফিসক্যাল স্ট্যাডি বিষয়ক ‘থিংক ট্যাঙ্ক’-এর পরিচালক পল জনসন বলেন, সরকার যে সহায়তা ঘোষণা করেছে তা সত্যিই বিশাল এবং বেশ উদার।
যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি বর্তমানে গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা ৯ শতাংশের বেশি। এই মূল্যস্ফীতি আরও বড়ার আশঙ্কা করেছেন অর্থনীতিবিদরা। ফলে অর্থনীতিতে নতুন করে ১৫ বিলিয়ন পাউণ্ডের সরকারী এই সহায়তা মূল্যস্ফীতি আরো বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন অনেকে। তবে চ্যান্সেলার ঋষি সুনাক মনে করেন, এই সহায়তা প্যাকেজ মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরণের কোনো প্রভাব ফেলবে না।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ডাউনিং স্ট্রিটে করোনা বিধি অমান্য করে পার্টি করার ঘটনার চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে ২৬ মে। ওই রিপোর্টে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের নেতৃত্বের ব্যর্থতা চি?িত করে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। যার ফলে পদত্যাগের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে তুমুল চাপে আছেন প্রধানমন্ত্রী। ওই সমালোচনা আড়াল করতে পরদিন সরকার এমন উদার সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে কি-না সেই প্রশ্নও উঠেছে।
তবে ঋষি সুনাক বলেছেন, সরকার দায়িত্ব থেকেই ওই প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।
তিনি বলেন, আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব আছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে যারা সর্বোচ্চ মূল্য দিচ্ছে তাদের সাহায্য করার। আমি বলেছিলাম আমরা মানুষের পাশে দাঁড়াব এবং এই সহায়তা প্যাকেজের মাধ্যমে সেটিই আমরা করেছি।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফজেম জানিয়েছে, সাধারণ পরিবারের এনার্জি বিল অক্টোবরে ৮০০ পাউণ্ড বৃদ্ধি পাবে এবং বছরের বিল বেড়ে হবে ২৮০০ পাউণ্ড। ইতিমধ্যে গত এপ্রিলে এনার্জি বিল বছরে গড়ে প্রায় ৭০০ পাউণ্ড বেড়েছে।
ঋষি সুনাক বলেছিলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধ, চীনে সাম্প্রতিক লকডাউন এবং মহামারীর অব্যাহত প্রভাবসহ ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির জন্য বৈশ্বিক নানা পরিস্থিতিকে মূলত দায়ী করা হয়েছিল। তবে  সেই পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে। এতে দরিদ্র পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছে।

যেভাবে এসব সহায়তা পাওয়া যাবে
ব্রিটেনের প্রতিটি পরিবার আসছে অক্টোবরে তাদের গ্যাস-ইলেক্ট্রিসিটির বিলে ৪শ পাউণ্ড ছাড় পাবে। এই অর্থ সরাসরি চলে যাবে এনার্জি কোম্পানিগুলোর কাছে। আর এনার্জি কোম্পানিগুলো গ্রাহকের হিসাবে ৪শ পাউণ্ড বাদ দিয়ে বিল পাঠাবে। এর ফলে যারা মাসিক চুক্তিতে বিল পরিশোধ করেন তাদের বিল কমে আসবে। আর যারা ‘প্রি-পেইড’ মিটারে বিল পরিশোধ করেন তাদের একাউন্টে ওই অর্থ জমা হয়ে যাবে।
এর আগে সরকার পরিবারগুলোর জন্য ২০০ পাউণ্ড এনার্জি বিল সহায়তা ঘোষণা করেছিলো। সেটি ফেরত দেয়ার কথা বলা হয়েছিলো। তবে সরকারের নতুন ঘোষণার ওই দুইশ পাউণ্ডকে বাড়িয়ে ৪শ করা হয়েছে এবং এই অর্থ ফেরত দেয়া লাগবে না।
দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য এককালীন ৬৫০ পাউণ্ডের যে সহায়তা ঘোষণা করা হয়েছে সেটি পাবেন মূলত বেনিফিটে রয়েছে এমন ব্যক্তি ও পরিবারগুলো। যারা ইউনিভার্সেল ক্রেডিট, লিগ্যাসি বেনিফিট এবং পেনশন ক্রেডিট পেয়ে থাকেন তারা তাদের ব্যাংক একাউন্টে এই অর্থ পেয়ে যাবেন। তবে দুই ধাপে এই অর্থ দেয়া হবে। প্রথম ভাগ আসবে জুলাই মাসে। আর পরবর্তী ভাগ আসবে অক্টোবরে। সরকারের হিসাবে প্রায় ৮ মিলিয়ন পরিবার ৬৫০ পাউণ্ড করে এককালীন এই সহায়তা পাবে।
আর যেসব পরিবারে পেনশনার আছে তারা এককালীন আরও ৩শ পাউণ্ড পাবেন। আর যারা প্রতিবন্ধী ভাতা পেয়ে থাকেন তারা পাবেন অতিরিক্ত ১৫০ পাউণ্ড। এসব অর্থের জন্য কোনো আবেদন করতে হবে না।
এদিকে এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা কেয়ারার এলাউন্স কিংবা পরসনাল ইনডিপেনডেন্স এলাউন্স (পিআইপি) পান তারা ৬৫০ পাউণ্ডের ওই সহায়তার যোগ্য হবেন না, যদি না তারা পাশাপাশি ইউনিভার্সেল ক্রেডিট বা শর্তযোগ্য অন্য বেনিফিট পেয়ে থাকেন।